সফল হাফেজ হওয়ার রূপরেখা: ইখলাস থেকে আমল পর্যন্ত

কুরআন হিফজ করার সহজ উপায় কী?
সফল হাফেজ হওয়ার রূপরেখা।দ্রুত হিফজ করার উপায় । কুরআন হিফজ করার সহজ উপায় কী?

বতর্মান যুগে কুফর ও তার সহচরদের লম্ফঝম্প, আধিপত্য বিস্তার ও আগ্রাসী কুটকৌশল সত্ত্বেও ইসলাম তার গতিময়তা ফিরে পাচ্ছে এবং বিস্তার লাভ করছে দিগ্বিদিক। ইসলামি চেতনা ও আদর্শের প্রতি আগ্রহ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, এবং এই পরিবর্তনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে মুসলিম যুবকরা। বিশেষত কুরআনের প্রতি তাদের গভীর আগ্রহ, কুরআন তিলাওয়াত এবং হিফজ করার প্রতি তাদের উদ্দীপনা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আল্লাহর কালামের প্রতি তাদের এই আকর্ষণ সমাজে ও ব্যক্তিগত জীবনে সুন্দর পরিবর্তন আনার সূচনা করছে।

তারা কুরআন তিলাওয়াত করছে, কঠোর পরিশ্রম করে কুরআন হিফজ করছে এবং উচ্চারণে বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য কঠোর অধ্যাবসায় করছে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে, সঠিক পদ্ধতি ও নির্দেশনার অভাবের কারণে অনেক যুবক মাঝপথে হোচট খাচ্ছে। তারা যথেষ্ট চেষ্টা সত্ত্বেও বিশুদ্ধ উচ্চারণে অভ্যস্ত হতে পারছে না, অথবা পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করতে ও তা আয়ত্তে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এছাড়া, কিছু যুবকের কুরআন হিফজে বিরতি বা আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সাহসের অভাবে হিফজ করা থেকে বিরত থাকা, এসব কারণে আমি এই নিবন্ধটি লিখতে উদ্যোগী হয়েছি। আমি আশা করি, আমার এই প্রবন্ধটি মসলিম সন্তানদেকে কুরআনের প্রতি মনোযোগী করবে এবং তাদের মধ্যে কুরআন হিফজ করার প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করবে। এ নিবন্ধটিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য আমি বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়েছি এবং তাঁদের সহায়তা গ্রহণ করেছি। প্রবন্ধটি তিনটি পরিচ্ছদে বিভক্ত করা হয়েছে, যাতে বিষয়টি সুসংগঠিত ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। তো চলুন শুরু করা যাক ।

প্রথম পরিচ্ছেদ: হিফজ শুরু করার আগে হিফজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি

Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran
Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran

১. ইখলাস অর্জন
কুরআন হিফজের যাত্রা শুরু করার আগে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি অর্জন করা অপরিহার্য তা হলো ইখলাসঅর্থাৎ একান্তভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিফজ করা। মনে রাখা দরকার, সালাত, সিয়াম, কাবার তওয়াফ কিংবা অন্যান্য নির্ভেজাল ইবাদত আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার মূল শর্ত হলো নিঃস্বার্থতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।

একইভাবে, আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম—যেমন আহার-পান, লেনদেন বা সামাজিক আচরণ—এসবকেও ইবাদতে রূপান্তর করতে হলে ইখলাস অপরিহার্য। কুরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ করা নিখাদ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, আর এই ইবাদত ইখলাস ছাড়া আল্লাহর নিকট কোনো মর্যাদা পায় না।

আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

অতএব যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।” (সূরা কাহাফ: ১১)

হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে:

আমি অংশীদারদের মধ্যে সবচেয়ে অমুখাপেক্ষী। যে আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করে কোনো আমল করে, আমি তাকে এবং তার আমল উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করি।” (মুসলিম – হা. ২৯৮৫)

অতএব কুরআন হিফজ বা তিলাওয়াত করার সময় লক্ষ্য থাকবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা প্রদর্শনীর ভাবনা থাকলে সেই আমল মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

২. কুরআনের মহত্ত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন

Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran
Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran

কুরআন হিফজের প্রস্তুতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কুরআনের মহান মর্যাদা ও তার অমুল্য-মূল্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:

  • কুরআন আল্লাহর কালাম—এটি অন্তরে অনুভব করা ।
    কুরআন শুধুমাত্র একটি বই নয়, এটি আল্লাহর কালাম বা কথা। আমাদের অন্তরে এই উপলব্ধি জাগরিত রাখতে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে।” (সূরা তওবাহ্: ৬)
কুরআনের সম্মান আসলে আল্লাহর সম্মান; আল্লাহর সম্মান ছাড়া অন্য কোন সম্মান নেই। অতএব, আল্লাহর কালামের চেয়ে অধিক সম্মানিত কিছু নেই।

  • কুরআন নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট ভাবনা
    কুরআনকে আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির জন্য হিদায়াত ও আলোকবর্তিকা হিসেবে নাজিল করেছেন। তিনি বলেন:

এটি (আল্লাহর) কিতাব, এতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” (সূরা বাকারা: ২)
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াত স্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।” (সূরা বাকারা: ১৮৫)

  • কুরআনের মর্যাদা ও সম্পর্কের কারণে সম্মান
    কুরআনের মর্যাদার ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট হয় এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যমে। যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে, সেই মাসের সম্মান অন্য মাসের চেয়ে অধিক। যে রাতে কুরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতের সম্মান অন্য রাতের তুলনায় অতুলনীয়। যে নবীর ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে, সে নবী পৃথিবীর অন্যান্য নবীদের তুলনায় মর্যাদাপূর্ণ। কুরআনের কারণে শেষ নবী, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সকল নবী-রাসূলের ইমাম ও আদম সন্তানের নেতা হয়েছেন। তিনি বলেন:

আমি আদম সন্তানের সরদার, এতে কোন অহঙ্কার নেই।”
আর যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করবে এবং তা অন্যদের শেখাবে, তার মর্যাদা হবে সবার চেয়ে উচ্চতর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
তোমাদের মধ্যে সেরা সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শেখায়।” (বুখারি)

  • কুরআনের প্রশংসা
    আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনের প্রশংসা করে বলেন:

আর আমি তো তোমাকে দিয়েছি পুনঃপুনঃ পঠিত সাতটি আয়াত ও মহান কুরআন।” (সূরা হিজর: ৮৭)

৩. কুরআন হিফজের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে হাফেজে কুরআনের ফজিলত ও সওয়াবের জ্ঞান লাভ

Preparing to become a Hafiz
Preparing to become a Hafiz

কুরআন হিফজের পথে প্রবাহিত হওয়ার পূর্বে, হাফেজে কুরআনের অসীম ফজিলত ও সওয়াব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত রয়েছে কিছু অমূল্য কথা:

  • ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা’য়ালা এ কিতাবের মাধ্যমে একটি জাতির উত্থান ঘটান এবং অপর একটি জাতির পতন নিশ্চিত করেন।” (মুসলিম: ১:৫৫৯, হা.৮১৭)

হাদীসটি একুটু ব্যাখ্যা করি:

এখানে মূলত কুরআনের শিখন এবং তার অনুসরণ করার মাধ্যমে জাতির উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কিত এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। যারা কুরআনকে মেনে চলবে, তারাই সম্মান, শক্তি, উন্নতি এবং ক্ষমতা লাভ করবে। আর যারা কুরআনকে অবজ্ঞা করবে বা উপেক্ষা করবে, তারা পতন এবং দুর্দশায় পতিত হবে।

এটি একটি মহামূল্যবান শিক্ষা যে, কুরআন আমাদের জীবনের পথনির্দেশক, এবং এর অনুসরণ করলে জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি সম্ভব। তবে যদি কুরআনের নির্দেশনা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তারা পতন ও অবনতির দিকে এগিয়ে যাবে।

এ হাদিসটি আমাদেরকে কুরআনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং এর অনুসরণ করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

 

  • ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে, তাকে একটি নেকি দেওয়া হবে, এবং প্রতিটি নেকি দশটি নেকির সমান হবে। আমি বলছি না যে, الم একটি হরফ, বরং ألف একটি হরফ, لام একটি হরফ, মিম একটি হরফ।” (তিরমিজি: ৫:৭৫, হা.২৯১)
  • আকবা বিন আমের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    তিনি বলেন, “আমরা সুফফায় বসে ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন এবং বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি চান যে প্রতিদিন বাতহা বা আকিক নামক স্থানে গিয়ে অপরাধ বা সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়াই বিনা পরিশ্রমে দুটি বড় উট পেয়ে আসুক? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা সবাই তা পছন্দ করি। তিনি বললেন, তোমরা কি মসজিদে এসে প্রতিদিন দুটি আয়াত শিখতে কিংবা তিলাওয়াত করতে পারো না? এটি তোমাদের জন্য দুটি উটের চেয়ে উত্তম।” (মুসলিম: ১:৫৫২, হা.৮,৩)
  • আবু উমামা বাহিলি রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর, কারণ কুরআন কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে।‘” (মুসলিম: ১:৫৫৩, হা.৮,৪)
  • আবদুল্লাহ বিন আমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “হাফেজে কুরআনকে বলা হবে, ‘পড়ো এবং উচ্চে ওঠো।তোমার পড়ার ধীরগতি অনুসারে তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।” (আবু দাউদ: ২:৫৩, হা.১৪৬৪)
  • ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি তার কওমের ইমামতি করবে।” (মুসলিম: ১:৪৬৫, হা.৬৭৩)
  • আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআনে পারদর্শী এবং নিয়মিত কুরআন পাঠ করে, সে সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গী। আর যে ব্যক্তি কষ্ট সত্ত্বেও কুরআন পাঠ করে, তার সওয়াব দ্বিগুণ হবে।” (বুখারি+ফাতহুল বারি: ৮:৬৯১, হা.৪৯৩৭)
  • আবু মুসা আশআরি রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে সে জামির ফলের মতো, যার ঘ্রাণ এবং স্বাদ উভয়ই চমৎকার। আর যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে না, সে খেজুর ফলের মতো, যার ঘ্রাণ নেই, তবে স্বাদ চমৎকার।” (বুখারি, মুসলিম)
  • কুরআন তিলাওয়াত ও মনোযোগী শ্রবণ
    কুরআন হিফজের জন্য সবচেয়ে সহায়ক বিষয় হলো কুরআন তিলাওয়াত করা ও মনোযোগসহ কুরআন শোনা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না।” (সূরা ফাতির: ২৯)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর, কুরআন তার তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।” (মুসলিম: ১:৫৫৩, হা.৮,৪)

  • কুরআন শ্রবণের গুরুত্ব
    আল্লাহ তা’য়ালা কুরআন শ্রবণ করার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন:

আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক, যাতে তোমরা রহমত লাভ কর।” (আরাফ: ২,৪)
লাইস বিন সা’দ বলেন, “কুরআন শ্রবণকারীর মতো দ্রুত কারোর ওপর রহমত অবতীর্ণ হয় না।” (আরাফ: ২,৪)

৪. কুরআন হিফজের পূর্বে কুরআন পাঠ ও হিফজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন

Establishing the rule of the Quran and implementing education
Establishing the rule of the Quran and implementing education

কুরআন হিফজের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার সময়, তার পাঠ (তিলাওয়াত) এবং হিফজের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে আমরা কিছু মূল বিষয় তুলে ধরছি:

  • সওয়াব ও মর্যাদার আশায় কুরআন পাঠ বা তিলাওয়াত
    কুরআন পাঠের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ভালোবাসা ও মর্যাদা লাভ করা। যেমন আগেও আলোচনা করা হয়েছে, কুরআন তিলাওয়াত করলে প্রতিটি হরফের বদলে আল্লাহ তা’য়ালা অসীম পুরস্কার প্রদান করেন। এটি একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য, যা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
  • কুরআনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার বাস্তবায়ন
    কুরআন পাঠের এক অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তার শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তার শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। এই শিক্ষা জীবনের প্রতিটি দিকেই প্রভাব ফেলতে সক্ষম, যদি আমরা সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করি।
  • চিন্তা শক্তি ও বোধ-বুদ্ধির পরিশুদ্ধি
    কুরআন হলো সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানের উৎস। এটি পাঠ করার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাশক্তি ও বোধ-বুদ্ধি পরিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

আমি প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনাসহ আপনার প্রতি কুরআন অবর্তীর্ণ করেছি। আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা।” (সূরা নাহাল: ৮৯)
এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং সকল জ্ঞানের মূল উৎস, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

  • কুরআনকে সহজ করে দেওয়া
    আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করেছেন, যাতে তারা তার মধ্যে নিহিত শিক্ষাকে গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

আর আমি তো কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব, কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?” (সূরা কামার: ১৭)
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ব্যাখ্যায় বলেন, “অর্থাৎ আমি কুরআনকে হিফজ করার জন্য সহজ করে দিয়েছি। যে ব্যক্তি কুরআন হিফজ করতে চায়, আমি তাকে সাহায্য করি। এখন প্রশ্ন হলো—এ জন্য কেউ আছো?”

৫. কুরআন মুখস্থ করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকা

কুরআন হিফজের শুরু এবং তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দৃঢ় ইচ্ছা। যদি কেবল ইচ্ছা না থাকে, তবে হিফজ কেবল একটি আশা কিংবা স্বপ্ন হিসেবেই থেকে যাবে। তাই, কুরআনের অসীম মর্যাদা, হাফেজদের মর্যাদা, কুরআন শোনা ও তিলাওয়াতের সওয়াবের প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করা এবং এ ব্যাপারে নিজেকে উৎসাহিত করা জরুরি।

  • ব্যস্ততা কমিয়ে হিফজের প্রতি মনোযোগী হওয়া
    কুরআন হিফজের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘসময় ধরে মনোযোগ সহকারে অধ্যবসায় (তিলাওয়াত) করা। সুতরাং, অন্যান্য দুনিয়াবি ব্যস্ততা হ্রাস করে কুরআন হিফজে আত্মনিবেশ করা এবং এই পথের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)

এটি প্রমাণিত যে, আল্লাহর পথে নিরলস প্রচেষ্টা চালানো একজন মুসলিমকে অবশ্যই সাফল্যের দিকে পরিচালিত করে। কুরআন হিফজের জন্যও এটি প্রযোজ্য—শুধু ইচ্ছা নয়, লাগাতার পরিশ্রম এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।

মুদ্দাকথা: অবিরাম প্রচেষ্টায় সাফল্য

যে ব্যক্তি অবিরত চেষ্টা করে, সে নিশ্চিতভাবে তার লক্ষ্যে পৌঁছায়। প্রতিটি প্রচেষ্টা, প্রতিটি চাষ, একদিন তার ফল দেয়। যেমন পিঁপড়া, যে বারবার চেষ্টা করে, পড়ে যায়, আবার উঠেও চেষ্টা করে, কখনও থামে না—এটাই তার সফলতার মূল চাবিকাঠি। কুরআনের শিক্ষার্থীও এই পিঁপড়ার মতো হতে হবে। একে একে, বারবার চেষ্টা করে, হতাশ না হয়ে, প্রতিটি চেষ্টায় নতুন উদ্যম নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

  • প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন হিফজের জন্য নির্ধারণ করা
    কুরআন হিফজের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো প্রতিদিন কিছু সময় নির্দিষ্ট করা, এবং তা নিয়মিতভাবে পালন করা। এটি যদি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেতে হয় তাহলে তো তাদের স্বতন্ত্র রুটিন অনুযায়ী হবে। তবে যারা ব্যাক্তিগত ভাবে হেফজ করতে চান তাদের জন্য যেমন—ফজর, আসর, মাগরিব বা যেকোনো উপযুক্ত সময়ে কুরআন পাঠ করা। তবে, মসজিদে কুরআন তিলাওয়াত করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। যেমন পূর্বের একটি
  •  হাদিসে এসেছে:

“أفلا يغدوا أحدكم إلى المسجد”
এটি প্রমাণ করে যে, মসজিদে কুরআন পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মসজিদের কুরআন হিফজ করার উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া অন্য কোথাও সম্ভব নয়, তাই এই পরিবেশটি বজায় রাখা সবচেয়ে শ্রেয়। এখন তো বর্তমান যোগে অনেক উন্নত মানের উন্নত পরিবেশের হাফিজিয়াহ্ মাদরাসা বিদ্যামান রয়েছে । তাই টেনশন করার প্রয়োজন নেই।

দ্বিতীয়ত মসজিদের আরেকটি ফজিলত রয়েছে, আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা  আনহু থেকে বর্ণিত, যারা মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য জড়ো হয় এবং পরস্পর মিলে দাওর (শোনা-শুনি) করে, তাদের ওপর বিশেষ প্রশান্তি সাকিনা নাযিল হয়, তাদেরকে আল্লাহর রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতাগণ তাদের বেষ্টন করে নেয় এবং আল্লাহ তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। (মুসলিম : ৪:২,৪৭, হা.২৬৯৯) অনেক সময় শরীর অলস ও উদ্দমহীন হয়ে পড়ে, তখন অপরের সঙ্গ চালিকা শক্তির ন্যায় কাজ করে এবং উৎসাহ প্রদান করে, যার ফলে কুরআন হিফজকারী আলস্য ত্যাগ করে পুনরায় হিফজে মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়।

৬. কুরআনে পারদর্শী একজন ভালো উস্তাদ গ্রহণ করা

ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, কেবলমাত্র মাসহাফ বা কুরআনের বই পড়া যথেষ্ট নয়; কুরআন শেখার জন্য এমন একজন উস্তাদ গ্রহণ করা জরুরি, যিনি পূর্বে কোন বিজ্ঞ উস্তাদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। সুলাইমান বিন মূসা রাহিমাহুল্লাহ একসময় বলেছিলেন, “কাগজের কুরআন থেকে কুরআন গ্রহণ করো না।” সাইদ তানুখি বলেন, “একসময় উস্তাদরা বলতেন, তোমরা কুরআন শিখো না খাতা থেকে, তোমরা কুরআন শিখো কুরআন থেকে।”

কুরআন শিক্ষার প্রকৃত পদ্ধতি হলো গভীর মনোযোগের সহিত শ্রবণ করা এবং মুখস্থ করা। ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলতেন, “আমি ৭০টিরও বেশি সুরা সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র জবান থেকে শিখেছি।” (বুখারি + ফাতহুল বারি: ৯:৪৬, হা.৫)

কিন্তু কুরআনের বাকি অংশ তিনি কীভাবে শিখেছেন? হাফেজ ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ তার বুখারি ব্যাখ্যায় বলেন, “তিনি (ইবনে মাসউদ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিদের কাছ থেকে কুরআনের বাকি অংশ শিখেছিলেন।” (ফাতহুল বারি: ৯:৪৮)

কুরআন শেখার জন্য উস্তাদ গ্রহণ করা অপরিহার্য, এবং সরাসরি উস্তাদের কাছ থেকে কুরআন শিক্ষা করা অতীব জরুরি। সাহাবারা তাদের ছাত্রদের কুরআন শেখানোর জন্য তাদেরকে সেই সাহাবিদের কাছে প্রেরণ করতেন, যারা সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কুরআন শিখেছেন।

সাহাবি মা’দি কারিব রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, “আমরা সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমাদেরকে সুরা শুআরা তিলাওয়াত করে শোনান।তিনি বললেন, ‘এ সুরা আমার কাছে নেই। তোমরা খাববাব বিন আরত এর কাছে যাও, তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এটি শিখেছেন।আমরা খাববাব বিন আরত এর কাছে গিয়ে সুরাটি তিলাওয়াত শুনলাম।” (মুসনাদ ৬:৩৪)

এছাড়া, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর জিবরাইল আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে কুরআন দাওর করতেন। যেই বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালামের সঙ্গে দুবার দাওর করেছেন। (বুখারি + ফাতহুল বারি: ৯:৪৩, হা.৪৯৯৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সরাসরি কুরআন শেখানোর জন্য উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন:

তোমরা চারজন থেকে কুরআন শিখো:
১. ইবনে উম্মে আব্‌দ,
২. উবাই বিন কাব,
৩. আবু হুজাইফার গোলাম সালেম,
৪. মুয়াজ বিন জাবাল থেকে।” (মুসলিম: ৪:১৯১৩, হা.২৪৬৪)

কুরআন হিফজ করার জন্য যে কোন এক ছাপার কুরআন বাছাই নির্দিষ্ট করা। যেমন: হফেজিয়া কুরআন

. শেষ থেকে কুরআন হিফজ আরম্ভ করা।

বিশেষ করে ছোট বাচ্চা, দুর্বল স্মরণ শক্তি বা অপেক্ষাকৃত কম আগ্রহীদের ব্যাপারে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা খুবই জরুরি। এর ফলে তারা অল্প সময়ে একটি সুরা মুখস্থ করতে পারবে, অন্য সুরার জন্য প্রস্তুতি নিবে ও উদ্যমী হবে।

. আল্লাহ তা’য়ালার নিকট স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, হিফজ করা ও হিফজ ধরে রাখার জন্য তওফিক চাওয়া।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছদ : প্রতিদিন কিছু অংশ মুখস্থ করার জন্য একটি চার্ট তৈরী করা :

. হিফজের ছাত্রের জন্য জরুরি এক বৈঠকে যতটুকু অংশ হিফজ করা সম্ভব প্রথমে তার পরিমাণ নির্ধারণ করা, বেশি নির্ধারণ না করা। বিশেষ করে যখন হিফজ শুরু করা হয় বা যখন খুব আগ্রহ থাকে। এতে অলসতা কাছে ঘেসতে পারবে না এবং কম সময়ে মুখস্থ হওয়ার ফলে কুরআন ত্যাগ করার প্রবণতাও সৃষ্টি হবে না। বরং প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী সে নিজকে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়। সে প্রত্যহ নির্ধারিত অংশ হিফজ করাই নিজের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য জ্ঞান করবে।

প্রচলিত কুরআন (মাসহাফে উসমানি) ভাল করে পড়তে সক্ষম না হলে, একজন শিক্ষকের নিকট হিফজ করার পূর্বে নির্ধারিত অংশ শিখে নেয়া।

. শব্দের উচ্চারণ নির্ভুল ও সঠিক রাখার জন্য কুরআন সামনে রাখা ও দেখে দেখে মুখস্থ করা।

এক এক আয়াত করে পড়া এবং পরবর্তী আয়াতের সাথে সংযোগ করা। এক আয়াত এক লাইন থেকে ছোট হলে দুআয়াত করে পড়া। মুখস্থ করার অংশ দুলাইন বা তিন লাইনের বেশি না বাড়ানো।

. হিফজের সময় আওয়াজ সামান্য উঁচু রাখা। কারণ, নিচু আওয়াজ অলসতা সৃষ্টি করে, আবার উচুঁ আওয়াজের ফলে ক্লান্তি আসে ও অপরের অসুবিধার কারণ হয়। এটা  স্বাভাবিক নিয়ম। কেউ যদি খুব একাগ্রতা ও নিবিঢ় চিত্তে নিচু আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করে, তবে কোন সমস্যা নেই। হ্যাঁ, জিহ্বার নাড়াচাড়া আবশ্যক। জিহ্বার নাড়াচাড়া ব্যতিত শুধু চোখ বুলানো যথেষ্ট নয়।

. হিফজের সময় আয়াতের উচ্চারণ তারতীলসহ করা অর্থাৎ ধীরে ধীরে ও বিরতি দিয়ে পড়া। তাজবিদের আহকামে ভুল না করা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, তুমি কুরআন তারতিলসহ পড়। [সুরা মুজ্জাম্মেল : ৪] কুরআন দ্রুত মুখস্থ করার জন্য তাড়াহুড়া না করা, জিহ্বা দ্রুত নাড়াচাড়া না করা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, কুরআন তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে তুমি তোমার জিহ্বাকে দ্রুত আন্দোলিত করো না। [কিয়ামাহ : ১৬]

দ্বিতীয়ত : এ পদ্ধতিতেই রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম সাহাবাদের কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আর কুরআন আমি নাযিল করেছি কিছু কিছু করে, যেন তুমি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পার ধীরে ধীরে এবং আমি তা নাযিল করেছি পর্যায়ক্রমে। [বনি ইসরাইল : ১,৬]

একবার আনাস রাদিআল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের কুরআন তিলাওয়াত কি রকম ছিল ? তিনি বলেন, টেনে টেনে পড়তেন, অতঃপর بسم الله الرحمن الرحيم  তিলাওয়াত করেন। তিনি বিসমিল্লাহ এর লা তে মদ করেন, আররাহমানে মা তে মদ করেন আররাহিমে হী তে মদ করেন। (বুখারি : ৯:৯১, হা.৫,৪৬)

এ নিয়মেই সাহাবায়ে কেরাম কুরআন তিলাওয়াত করতেন। একদা ইবনে আব্বাসের ছাত্র আবুহাজার বলেন, আমি খুব দ্রুত কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি, আমি তিন দিনে কুরআন খতম করি। ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তা’য়ালা  আনহু তার প্রতিবাদ করে বলেন, চিন্তা, মনোযোগ ও তারতিলসহ এক রাতে শুধু সুরায়ে বাকারা পড়াই আমার কাছে উত্তম ও পছন্দনীয়, তোমার ন্যায় তিলাওয়াতের চেয়ে। অন্য বর্ণনায় আছে, প্যাঁচালের ন্যায় পড়ার চেয়ে। হিফজের সময় তারতিলসহ পড়ার ফলে চিন্তা ও গবেষণার সুযোগ হয়, সঙ্গে সঙ্গে আয়াতের অর্থ জানা যায় এবং হিফজও হয় সুদৃঢ়।

. নির্ধারিত অংশ মুখস্থ হলে নিজের কানে আওয়াজ পৌঁছে এমন উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করা।

. একবার না দেখে পড়ার পর পুনরায় দেখে পড়া, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, হিফজ ঠিক আছে, শব্দ-বাক্য বা জের-জবর-পেশে এর উচ্চারণগত কোন ভুল নেই।

. জরুরি ভিত্তিতে মুখস্থ অংশটুকু কোন অভিজ্ঞ উস্তাদকে পড়ে শোনানো।

১,. পূর্বে মুখস্থ অংশের সাথে পরবর্তী মুখস্থ অংশটুকু মিলিয়ে নেয়া। এভাবে প্রতিদিন মিলাতে থাকা।

 

তৃতীয় পরিচ্ছদ : হিফজ সমাপনের পর করনীয় :

হিফজ নিয়ে রিয়া বা লৌকিকতায় লিপ্ত না হওয়া।

আমাদের পরিভাষায় রিয়া দ্বারা উদ্দেশ্য : হিফজ সমাপনের পর বা বিশ্বমানের তিলাওয়াত ও শ্রুতি মধুর কণ্ঠের জন্য সম্মান ও মর্যাদার প্রত্যাশী থাকা, মানুষের অন্তরে আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা, যা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ের জিনিস হচ্ছে শিরকে আসগার। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল, শিরক আসগার তথা ছোট শিরক কি ? তিনি বললেন, রিয়া তথা লোক দেখানো আমল।

অতঃপর তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাদের আমলের প্রতিদান দিবেন, তখন রিয়াকারীদের বলবেন, তোমরা তাদের কাছে যাও, যাদের দেখানোর জন্য তোমরা আমল করতে, দেখ তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাওয়া যায় কি-না? (আহমাদ : ৫:৪২৮)

যে ব্যক্তি কুরআনকে নিয়ে রিয়াতে লিপ্ত হবে, সে নিজকে কঠিন আজাবের সম্মুখিন করবে। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুর হাদিসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, সর্ব প্রথম যাদের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন ফয়সালা হবে, তার মধ্যে ঐ ব্যক্তি রয়েছে যে, ইলম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন তিলাওয়াত করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে, অতঃপর তার ওপর প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে, সে তা স্বীকারও করবে। তাকে বলা হবে, তুমি এর ওপর কি আমল করেছ? সে বলবে, আমি ইলম শিক্ষা করেছি, অপরকে শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পড়েছি।

তাকে বলা হবে, তুমি মিথ্যে বলছ, বরং তুমি ইলম শিক্ষা করেছ, যাতে তোমাকে আলেম বলা হয়, কুরআন পড়েছ যাতে তোমাকে ক্বারি বলা হয়। অতঃপর তাকে চেহারার ওপর দাঁড় করিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হবে। (মুসলিম : ৩:১৫১৩, হা.১৯,৫) সুতরাং মুক্তি পেতে হলে, ইখলাস এবং নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে পরিশুদ্ধ রাখা জরুরি।

কুরআন মোতাবেক আমল করা এবং সে অনুযায়ী আদব, আখলাক চরিত্রগঠন করা :

কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আমল করার জন্য ও কুরআন মোতাবেক জীবন পদ্ধতি পরিচালনা করার জন্য। ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলেন, তোমাদের আমলের জন্যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, সুতরাং আমলের জন্য কুরআন পড়। তোমাদের কেউ কেউ পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করে, একটি হরফও বাদ পড়ে না, অথচ মোটেও সে কুরআন অনুযায়ী আমল করে না।

কতক বিজ্ঞজন বলেছেন, কেউ কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে নিজের ওপরই অভিসম্পাত বা অভিসাপ করে, অথচ সে জানেও না। যেমন কুরআনের অনেক জায়গায় রয়েছে অত্যাচারি তথা নিজেদের ক্ষতি সাধনকারীদের ওপর আল্লাহর লা’নত। অথচ কুরআনের ওপর আমল না করার কারণে সে নিজেই এর অন্তর্ভুক্ত। আবার সে তিলাওয়াত করে, মিথ্যুকদের ওপর আল্লাহর লা’নত। অথচ কুরআন অনুযায়ী আমল না করে সে নিজেও একজন মিথ্যুক। আনাস রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলেন, অনেক কুরআন পাঠকারী এমন রয়েছে, কুরআন যাদেরকে অভিসম্পাত বা  অভিসাপ করে।

 

নিজেকে নিয়ে অহংকারে লিপ্ত না হওয়া বা অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান না করা :

অহংকার বা অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করার অর্থ আল্লাহর করুনা বা তওফিকের কথা ভুলে নিজের কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টার ফলে হিফজ সমাপন সমাপ্ত হয়েছে মনে করা ও আত্মতুষ্টিতে লিপ্ত হওয়া। অথচ আল্লাহ তা’য়ালা তাকে হিফজের তওফিক দিয়েছেন, যদি তার অনুগ্রহ না হত, কখনো সে পূর্ণ কুরআন বা তার কিয়দাংশ মুখস্থ করতে সক্ষম হত না।

তাই হিফজের জন্য সর্বতভাবে আল্লাহ তা’য়ালার অনুগ্রহ স্বীকার করা, তার কৃতজ্ঞতা আদায় করা এবং শুধু তার দিকেই এ নেয়ামতের নিসবত করা জরুরি। মানুষের ওপর বড়ত্বের প্রকাশই অহংকার, এ থেকে বিরত থাকা। কারণ, মানুষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয় একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার মেহেরবানীতে, তার করুনায়।

তাই অন্যদের মূর্খ ভাবা বা তুচ্ছজ্ঞান করার কোন সুযোগ নেই। যে এতে লিপ্ত হয়, তার হয়তো এর শাস্তির কথা জানা নেই। হাদিসে কুদসিতে রয়েছে, আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, অহংকার আমার চাদর, বড়ত্ব আমার পরিধেয় বস্ত্র, যে আমার এ বস্ত্র নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। (আবু দাউদ : ৪:৩৫,) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, যার অন্তরে সামান্য পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মুসলিম ১:৯৩ হা.৯১)

কুরআন মুখাস্থ রাখার জন্য বারবার তিলাওয়াত করা এবং আগ্রহ সৃষ্টির জন্য ফযিলতপূর্ন হাদিস ইত্যাদি অধ্যয়ন করা। কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত ও তা ভুলে যাওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে জানা।

যেমন:

  • ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, হাফেজে কুরআনের উদাহরণ উটের মালিকের ন্যায়, যদি সে তাকে বেঁধে রাখে, নিজ আয়ত্তে রাখতে পারবে, অন্যথায় সে চলে যাবে।(বুখারি ৯:৭৯ হা.৫,৩১)
  • সাহাবি আব্দুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কারো এমন বলা যে, আমি অমুক আয়াত ভুলে গেছি, খুবই খারাপ। বরং তাকে ভুলানো হয়েছে। তার উচিৎ বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। কারণ, কুরআন মানুষের হৃদয় থেকে উটের চেয়ে দ্রুত পলায়নপর।(বুখারি : ৯:৭৯, হা.৫৫৩২)
  • আবুমুসা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, তোমরা বারবার কুরআন পড়, আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার জান, রশি থেকে উটের পলায়ন করার চেয়েও কুরআন দ্রুত পলায়কারী।(বুখারি : ৯:৭৯, হা.৫,৩৩) এসব বর্ণনা ও অন্যান্য বর্ণনার ফলে আলেমগণ কুরআন খতমের কম মেয়াদ ও দীর্ঘ মেয়াদ ঠিক করে দিয়েছেন, যা অতিক্রম করা বৈধ নয়।

কম মেয়াদ : তিন দিন। আব্দুল্লাহ বিন আমর হতে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, যে তিন দিনের কমে কুরআন খতম করবে, সে কিছুই বুঝবে না। (আবু দাউদ : ২:১১৬, হা.১৩৯৪)

মুয়াজ বিন জাবাল রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিন দিনের কমে কুরআন খতম করা মাকরুহ বলতেন। (ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন) ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা’য়ালা  আনহু বলতেন, তোমরা সাত দিনে কুরআন খতম কর, তিন দিনের কমে কুরআন খতম কর না। (ফাতহুল বারি : ৯:৯৭)

তিন দিনের কম কুরআন খতমে দ্রুত পড়ার দরুন চিন্তা-ফিকিরের সুযোগ থাকে না, বিরুক্তির উদ্রেক হয়, শব্দ উচ্চারণ (তালাফফুজ) সঠিক হয় না, তিলাওয়াতও সুন্দর হয় না ইত্যাদি। যে সকল আকাবের ও বুযর্গানে দ্বিনের ব্যাপারে বর্ণিত রয়েছে, তারা তিন দিনের কমে কুরআন খতম করেছেন, সম্ভবত তাদের নিকট আমাদের বর্ণিত হাদিসগুলো পৌঁছেনি বা দ্রুত পড়া সত্ত্বেও তারা কুরআনে মনোযোগ ঠিক রেখেছেন বা রমজান ইত্যাদির মত কোন ফজিলতপূর্ণ সময়ে তারা এমন করেছেন। তারা এ সময়কে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। এটা তাদের চিরাচরিত নিয়ম ছিল না।

কুরআন খতমের দীর্ঘ মেয়াদ : কুরআন খতমের দীর্ঘ মেয়াদ চল্লিশ দিন। আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে প্রশ্ন করেন, কত দিনে কুরআন খতম করব? তিনি বলেন, চল্লিশ দিনে। (তিরমিজি : ৫:১৯৭, হা.২৯৪৭)

এ হাদিসের কারণে ইসহাক ইবনে রাহওয়ে বলেন, চল্লিশ দিনের অধিক অতিবাহিত হবে, অথচ কুরআন খতম হবে না, এটা খুবই খারাপ। (তিরমিজি : ৫:১৯৭) তিনি আরো বলেন, চল্লিশ দিনের মধ্যে কুরআন খতম না করা মাকরুহ। (ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন)

গুনাহ নাফরমানির কারণে কুরআন চলে যায় :

হাদিসে রয়েছে গুনাহের কারণে মানুষ অনেক নেয়ামত হতে বঞ্চিত হয়, বিভিন্ন মুসিবতে গ্রেফতার হয়, যার মধ্যে বড় মুসিবত হচ্ছে কুরআন ভুলে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, মানুষ সামান্য মুসিবত বা তার চেয়েও ছোট বা বড় মুসিবতে নিজ গুনাহের কারণেই পতিত হয়। আর আল্লাহ তা’য়ালা যেসব গুনা ক্ষমা করেন, তার পরিমাণ তো অনেক বেশি। (তিরমিজি : ৫:৩৭৭, হা.৩২৫২) কুরআন ভুলার ক্ষেত্রে গোনাই বেশি দায়ী। জাহহাক বিন মুজাহিম বলেন, যে কুরআন পড়ে ভুলে গেছে, সে মূলত নিজ গুনাহের কারণেই ভুলে গেছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন। [শুরা : ৩]

কুরআন ভুলা সব চেয়ে বড় মুসিবত:

(ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন) আগের যুগে যে কুরআন ভুলে যেত, সে খুবই কোনঠাসা হয়ে যেত। ইবনে সিরিন থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে কুরআন ভুলে যেত তাকে তারা ঘৃনা করতেন, তার ব্যাপারে তারা কঠোর মন্তব্য করতেন। (ফাতহুল বারি : ৯:৮৬) এর কারণ হিসেবে কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে পূর্ণ কুরআন বা তার কিয়দাংশ মুখস্থ করল, তার মর্যাদা অন্যদের তুলনায় বৃদ্ধি পেল, যদি সে মর্যাদার অবমাননা করে, অথবা মর্যাদা থেকে ছিটকে পড়ে, সে তিরস্কারের পাত্র। কুরআন না পড়ার অর্থ অজ্ঞতার শিকার হওয়া, শিক্ষা অর্জন করে অজ্ঞদের অর্ন্তভুক্ত হওয়া সামান্য বিষয় নয়। (ফাতহুল বারি : ৯:৮৬)

কারো মতে কুরআন ভুলে যাওয়া মারাত্বক গুনা। আবুল আলিয়া আনাস রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, আমরা সব চেয়ে বড় গুনাহ মনে করতাম, কুরআন পড়ে অলসতা বা গাফলতির কারণে ভুলে যাওয়া। (ফাতহুল বারি : ৯:৮৬) ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কতক আলেম কুরআন ভুলে যাওয়া ব্যক্তিকে কুরআন বিমূখ ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করে এ আয়াতের অর্ন্তভুক্ত জ্ঞান করেছেন, আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য  হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়।

সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? [তহা : ১২৪-১২৫] আল্লাহ বলবেন, তিনি বলবেন, এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। [তহা : ১২৬] সামান্য হলেও সে এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, কুরআন তিলাওয়াত না করা, তার ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করা, সেচ্চায় ভুলে যাওয়ারই শামিল, যা মারাত্বক অপরাধ। (ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন)

 

. কুরআন মুখস্থ রাখার পদ্ধতি:

কুরআন মুখস্থ রাখার জন্য সব চেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, প্রতি দিন নির্দিষ্ট সময়ে তওফিক মোতাবিক তিলাওয়াত করা। যাদের পক্ষে তা সম্ভব নয়, তারা নিম্নের পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে :

()

  • এক পারা আট ভাগ করে নেয়া : ফজরের সুন্নত ব্যতীত অন্যান্য সুন্নতে মুয়াক্কাদাতে প্রতি দুরাকাতে একঅষ্টমাংশ পড়া। (জোহরের আগে-পরে সুন্নতে তিন অংশ, মাগরিবের সুন্নতে এক অংশ, এশার সুন্নতে এক অংশ, এভাবে আট অংশের পাঁচ অংশ পড়া হয়ে যাবে।)
    • আসরের আগে দুরাকাত সালাতে এক অংশ পড়া। (এক অষ্টমাংশ)
    • ফরজ সালাতে ও তাহাজ্জুদের সালাতে দুই অংশ পড়া। (দুই অষ্টমাংশ) এভাবে প্রতি দিন সর্ব নিম্ন এক পারা অবশ্যই তিলাওয়াত করা।

() নফল নামাজে, গাড়িতে, আজান-একামাতের মাঝখানে, বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে, অফিসে যাওয়ার পথে এবং আসার সময়… আরো অন্যান্য সময়ে কুরআন তিলাওয়াত করা।

(ফজর নামাজের পরে সামান্য সময়ের জন্যে হলেও কুরআন পড়তে বসা, অন্তত পক্ষে এক অষ্টমাংশ তিলাওয়াত করা।

() আরো উঁচু হিম্মত সম্পন্ন লোক মনজিল পদ্ধতিতে এক সপ্তাহে পূর্ণ কুরআন খতম করতে পারেন, নিম্নের বিন্যাস অনুসারে মাশায়েখ ও ওলামায়ে কেরামরা কুরআন খতম করতেন :

  • প্রথম দিনের পরিমাণ :সুরায়ে ফাতেহা থেকে সুরায়ে মায়েদার আগ পর্যন্ত।
  • দ্বিতীয় দিনের পরিমাণ :সুরায়ে মায়েদা থেকে সুরায়ে ইউনুসের আগ পর্যন্ত।
  • তৃতীয় দিনের পরিমাণ :সুরায়ে ইউনুস থেকে সুরায়ে মারইয়ামের আগ পর্যন্ত।
  • চতুর্থ দিনের পরিমাণ :সুরায়ে মারইয়াম থেকে সুরায়ে শুআরার আগ পর্যন্ত।
  • পঞ্চম দিনের পরিমাণ :সুরায়ে শুআরা থেকে সুরায়ে সাফ্‌ফাতের আগ পর্যন্ত।
  • ষষ্ট দিনের পরিমাণ :সুরায়ে সাফ্‌ফাত থেকে সুরায়ে কাফ এর আগ পর্যন্ত।
  • সপ্তম দিনের পরিমাণ :সুরায়ে কাফ থেকে সুরায়ে নাস এর শেষ পর্যন্ত।

আলাদা আলাদা এ পরিমাণ স্মরণ রাখার জন্য (فمي مشوق ) শব্দটি মুখস্থ রাখা যায়। ف দ্বারা সুরায়ে ফাতেহার শুরু, م দ্বারা সুরায়ে মায়েদার শুরু, ي দ্বারা সুরায়ে ইউনুসের শুরু, م দ্বারা সুরায়ে মারইয়ামের শুরু, ش দ্বারা সুরায়ে শুআরার শুরু, و দ্বারা সুরায়ে সাফ্‌ফাতের শুরু, ق দ্বারা সুরায়ে ক্বাফ এর শুরু। যার দশ পারার কম মুখস্থ তার উচিত পুরো মুখাস্থ অংশ প্রতি পনের দিন অন্তর একবার অবশ্যই পড়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তওফিক দিন। আমীন। ছুম্মা আমীন।
এখনই কুরআন হিফজের যাত্রা শুরু করুন! আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই পবিত্র যাত্রায় অংশ নিন এবং প্রতিদিন কিছু সময় নির্ধারণ করে আপনার লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যান। আপনার জীবনে কুরআনকে আনার জন্য আজ থেকেই প্রস্তুতি নিন। হিফজের জন্য সঠিক পদ্ধতি জানুন এবং আপনার অগ্রযাত্রা শুরু করুন। এসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট পেতে নিয়মিত টিসি-কম্পিউটার ভিজিট করুন।

Table of Contents

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Scroll to Top