NuraniCalss3FinalExam2025
নূরানী ৩য় শ্রেণির সিলেবাস ২০২৫, সমাপনী পরীক্ষা সিলেবাস, নূরানী সিলেবাস, আরবী বাংলা ইংরেজী সিলেবাস, নূরানী ৩য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণির পরীক্ষা, কুরআন মাজীদ, হাদীস, তাজবীদ,

নূরানী ৩য় শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার সিলেবাস 2025 । চটকি বাড়ী বোর্ড ভূমিকা: ২০২৫ সালের নূরানী ৩য় শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা সিলেবাস বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত হয়েছে, যাতে ছাত্রদের জন্য সঠিক প্রস্তুতির পথ সুগম

নূরানী ৩য় শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার সিলেবাস 2025 । চটকি বাড়ী বোর্ড

নূরানী ৩য় শ্রেণির সিলেবাস ২০২৫
নূরানী ৩য় শ্রেণির সিলেবাস ২০২৫, সমাপনী পরীক্ষা সিলেবাস, নূরানী সিলেবাস, আরবী বাংলা ইংরেজী সিলেবাস, নূরানী ৩য় শ্রেণি, ৩য় শ্রেণির পরীক্ষা, কুরআন মাজীদ, হাদীস, তাজবীদ,

ভূমিকা:

২০২৫ সালের নূরানী ৩য় শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষা সিলেবাস বিস্তারিতভাবে নির্ধারিত হয়েছে, যাতে ছাত্রদের জন্য সঠিক প্রস্তুতির পথ সুগম হয়। এই সিলেবাসে আরবী, বাংলা, ইংরেজী, গণিত, কুরআন মাজীদ, হাদীস, দুআ, মাসআলা, ও আস: হুসনা বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি বিষয়ের জন্য আলাদা আলাদা কার্যক্রম ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা রয়েছে। আরবী, বাংলা, ইংরেজী এবং গণিতের সিলেবাসে লেখা, প্রশ্নোত্তর, শব্দার্থ, কবিতা, বাক্য গঠন, শূন্যস্থান পূরণ এবং অন্যান্য বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া কুরআন মাজীদ ও হাদীস বিষয়গুলোর জন্য মৌখিক পরীক্ষারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিটি বিষয়ের জন্য সুন্দর লেখা এবং সঠিক কায়দা অনুসরণ করে পড়াশোনা করার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা সাফল্যের সঙ্গে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে।

বিষয়: আরবী লেখা # পূর্ণমান: ১০০

  1. সূরা বাকারার প্রথম ৭ আয়াত, আয়াতুল কুরসি ও সূরা হাশরের শেষ ৩ আয়াত। যেকোনো একটি লেখা (মার্কস-২৫)
  2. সূরা কাফিরুন থেকে সূরা নাস পর্যন্ত যে কোনো ২টি লেখা (মার্কস-২০)
  3. আদিয়ায়ে সালাত থেকে যেকোনো দুটি। পৃষ্ঠা নং ২১, ১২ সম্পূর্ণ  । (মার্কস-২০)
  4. তাজবীদ থেকে ৫টি  (সূরা ফীল থেকে যে কোনো এক আয়াতের চিহ্নিত স্থানের কায়দাগুলো লেখা। (মার্কস-২০)
  5. সুন্দর লেখার জন্য ১০ নাম্বার নির্ধারিত।

ট্রেনিং সেন্টারের আঙ্গিকে তারিকায়ে তা’লিম

বিষয়: বাংলা # পূর্ণমান: ১০০

১. শব্দার্থ লেখ যে কোনো ১০টি । পৃষ্ঠা নং ৮, ১৬, ২১, ২৮, ৩৩, ৩৭, ৪৬ । ( মার্কস- ১০ )
২. কবিতা লেখ যে ১টি:  প্রথম দশ লাইন । পৃষ্ঠা নং দ্রষ্টব্য: ১১, ২৬, ৩১, ৪৯ । ( মার্কস- ১০)
৩. প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও: যে কোনো ৫টি । পৃষ্ঠা নং- ১০, ২৫, ৩০,  ৩৬, ৪৮ সম্পূর্ণ । ( মার্কস-১০ )
৪. বাক্য গঠন কর: যে কোনো ৫টি । পৃষ্ঠা নং- ৬, ১০, ২৫, ৩৬, ৪৪ ( মার্কস-১০ )
৫. যুক্তবর্ণগুলো বিশ্লেষণ কর: যে কোনো ১০টি। পৃষ্ঠা নং-  ১৬, ২১, ২২, ৩৩, ৩৮ । ( মার্কস-০৫ )
৬. সঠিক উত্তরে টিক ছিন্ন দাও: যে কোনো ৫টি।  পৃষ্ঠা নং-  ২৫, ৪০, ৪৪ । ( মার্কস -০৫)
৭. ছন্দ বা বাক্য সাজাও: যে কোনো ৫টি। পৃষ্ঠা নং- ১০, ১৯, ৩৬, ৪০ । ( মার্কস-১০ )
৮. শূন্যস্থান পূরণ কর: যে কোনো চারটি । পৃষ্ঠা নং  ১৪, ২৭, ৪০, ৪৪ । ( মার্কস-১২ )
৯. ব্যকরণ থেকে দুইটি। পৃষ্ঠা নং- ৫১ ও ৫২ । ( মার্কস-২০ )
* সুন্দর লেখার জন্য ০৮ নাম্বার নির্ধারিত ।

বিষয়: ইংরেজী # পূর্ণমান: ১০০

১. শব্দার্থ লেখা: যে কোন ১০টি।  পৃষ্ঠা নং:- ১২, ১৬, ২০, ৩৩ ।   মার্কস-১০
২. কবিতা লেখা: প্রথম ৮/১০ লাইন।  যে কোন ১টি ।  পৃষ্ঠা নং- ১১, ৩১, ৩৯ । (মার্কস-১৫)
৩. বাংলা কর: যে কোন ৫টি। পৃষ্ঠা নং- ২৪, ৩৫, ৪০। (মার্কস-১০)
৪. ইংরেজী কর: যে কোন ৫টি। পৃষ্ঠা নং- ৯, ১৩, ২০, ২২। (মার্কস-১৫)
৫. ইংরেজীতে উত্তর দাও: যে কোন ৫টি। পৃষ্ঠা নং- ১০, ২১, ২৫। (মার্কস-১৫)
৬. বাক্য গঠন কর: যে কোন ৫টি। পৃষ্ঠা নং- ৩৪  (মার্কস-১০)
৭. শূন্যস্থান পূরণ কর: যে কোন ৫টি । পৃষ্ঠা নং- ২৬, ৩০, ৪১ । (মার্কস-১৫)
* সুন্দর লেখার জন্য ১০ নাম্বার নির্ধারিত।

বিষয়: গণিত # পূর্ণমান: ১০০

১. অঙ্কে লেখা:  পৃষ্ঠা নং:- ৯, ৩৪ ।   মার্কস-১০
২. কথায় লেখা:   পৃষ্ঠা নং- ৯ ও ৪ । (মার্কস-১০)
৩. চিহ্ন দেখে অঙ্ক করা।  পৃষ্ঠা নং- ১৬,২০, ২৫। (মার্কস-১০)
৪. সরল করা ১টি।  পৃষ্ঠা নং- ৩১। (মার্কস-১০)
৫. দশমিকের যোগ ও বিয়োগ। পৃষ্ঠা নং- ৩৪। (মার্কস-১০)
৬. ভগ্নাংশ কর: যে কোন ২টি। । পৃষ্ঠা নং- ৪১  (মার্কস-১০)
৭. প্রশ্নমূলক অঙ্ক : যে কোন ২টি। (মার্কস-১৫)
২৩ নং পৃষ্ঠার ১ থেকে ৬ পর্যন্ত।
২৬ নং পৃষ্ঠার ৪ থেকে ৭ পর্যন্ত।
২৯ নং পৃষ্ঠার ১ থেকে ৫ পর্যন্ত।
৮. নামতা লেখা: ১টি। পৃষ্ঠা নং- ১১ থেকে ১৫ এর নামতা পর্যন্ত ।  (মার্কস-১০)
৯. জ্যামিতি । পৃষ্ঠা নং-৪২ ও ৪৩ । (মার্কস-১০)
১০. প্রশ্নোত্তর দাও: ২টি । পৃষ্ঠা নং- ৬, ৯, ১০, ১৪, ২৭ । (মার্কস-১০)

বিষয়: কুরআন মাজীদ (মৌখিক) # পূর্ণমান: ১০০

১. দেখে দেখে তেলাওয়াত থেকে ২টি।  ৮ নং পারা, ১৫ নং পারা এবং ২১ নং পাডরা থেকে ২৫ নং পারা পর্যন্ত । (মার্ক-৪০)
২. মুখস্ত করা থেকে ২টি। ১১ সূরা, সুরা ইয়াসিন ও সূরা ওয়াকিয়াহ্ থেকে । (মার্কস-২০)
৩. আদইয়ায়ে সালাত থেকে একটি (সম্পূর্ণ) মার্কস-১০
৪. তাজবীদ থেকে ৫টি । ( মার্কস-২৫
( মাখরাজ, মদ্দ মোট ১০ প্রকার, নুনে-সাকিন ও মিম-সাকিন, তানভিন এবং اللہ শব্দের লাম ও ر  পুর ও বারিক পড়ার কায়দা। )
* বলিষ্ঠ কন্ঠের জন্য পাঁচ মার্কস।

বিষয়: হাদীস, দুআ, মাসআলা ও আস: হুসনা # পূর্ণমান: ১০০

১. দেখে দেখে তেলাওয়াত থেকে ২টি।  ৮ নং পারা, ১৫ নং পারা এবং ২১ নং পারা থেকে ২৫ নং পারা পর্যন্ত । (মার্ক-৪০)
২. মুখস্ত করা থেকে ২টি। ১১ সূরা, সুরা ইয়াসিন ও সূরা ওয়াকিয়াহ্ থেকে । (মার্কস-২০)
৩. আদইয়ায়ে সালাত থেকে একটি (সম্পূর্ণ)  মার্কস-১০।
৪. তাজবীদ থেকে ৫টি । ( মার্কস-২৫)
( মাখরাজ, মদ্দ মোট ১০ প্রকার, নুনে-সাকিন ও মিম-সাকিন, তানভিন এবং اللہ শব্দের লাম ও ر  পুর ও বারিক পড়ার কায়দা। )
* বলিষ্ঠ কন্ঠের জন্য পাঁচ মার্কস।

সার্বিক যোগাযোগ
01816-705655
01712-120786

সিলেবাসটির pdf প্রয়োজন হলে আমাকে কমেন্ট করে জানান।

কুরআন হিফজ করার সহজ উপায় কী?
সফল হাফেজ হওয়ার রূপরেখা।দ্রুত হিফজ করার উপায় । কুরআন হিফজ করার সহজ উপায় কী?

সফল হাফেজ হওয়ার রূপরেখা: ইখলাস থেকে আমল পর্যন্ত বতর্মান যুগে কুফর ও তার সহচরদের লম্ফঝম্প, আধিপত্য বিস্তার ও আগ্রাসী কুটকৌশল সত্ত্বেও ইসলাম তার গতিময়তা ফিরে পাচ্ছে এবং বিস্তার লাভ করছে

সফল হাফেজ হওয়ার রূপরেখা: ইখলাস থেকে আমল পর্যন্ত

কুরআন হিফজ করার সহজ উপায় কী?
সফল হাফেজ হওয়ার রূপরেখা।দ্রুত হিফজ করার উপায় । কুরআন হিফজ করার সহজ উপায় কী?

বতর্মান যুগে কুফর ও তার সহচরদের লম্ফঝম্প, আধিপত্য বিস্তার ও আগ্রাসী কুটকৌশল সত্ত্বেও ইসলাম তার গতিময়তা ফিরে পাচ্ছে এবং বিস্তার লাভ করছে দিগ্বিদিক। ইসলামি চেতনা ও আদর্শের প্রতি আগ্রহ প্রতিনিয়ত বাড়ছে, এবং এই পরিবর্তনের পেছনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে মুসলিম যুবকরা। বিশেষত কুরআনের প্রতি তাদের গভীর আগ্রহ, কুরআন তিলাওয়াত এবং হিফজ করার প্রতি তাদের উদ্দীপনা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। আল্লাহর কালামের প্রতি তাদের এই আকর্ষণ সমাজে ও ব্যক্তিগত জীবনে সুন্দর পরিবর্তন আনার সূচনা করছে।

তারা কুরআন তিলাওয়াত করছে, কঠোর পরিশ্রম করে কুরআন হিফজ করছে এবং উচ্চারণে বিশুদ্ধতা অর্জনের জন্য কঠোর অধ্যাবসায় করছে, যা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে, সঠিক পদ্ধতি ও নির্দেশনার অভাবের কারণে অনেক যুবক মাঝপথে হোচট খাচ্ছে। তারা যথেষ্ট চেষ্টা সত্ত্বেও বিশুদ্ধ উচ্চারণে অভ্যস্ত হতে পারছে না, অথবা পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করতে ও তা আয়ত্তে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এছাড়া, কিছু যুবকের কুরআন হিফজে বিরতি বা আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সাহসের অভাবে হিফজ করা থেকে বিরত থাকা, এসব কারণে আমি এই নিবন্ধটি লিখতে উদ্যোগী হয়েছি। আমি আশা করি, আমার এই প্রবন্ধটি মসলিম সন্তানদেকে কুরআনের প্রতি মনোযোগী করবে এবং তাদের মধ্যে কুরআন হিফজ করার প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি করবে। এ নিবন্ধটিকে কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার জন্য আমি বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিয়েছি এবং তাঁদের সহায়তা গ্রহণ করেছি। প্রবন্ধটি তিনটি পরিচ্ছদে বিভক্ত করা হয়েছে, যাতে বিষয়টি সুসংগঠিত ও স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়। তো চলুন শুরু করা যাক ।

প্রথম পরিচ্ছেদ: হিফজ শুরু করার আগে হিফজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি

Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran
Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran

১. ইখলাস অর্জন
কুরআন হিফজের যাত্রা শুরু করার আগে সর্বাগ্রে যে বিষয়টি অর্জন করা অপরিহার্য তা হলো ইখলাসঅর্থাৎ একান্তভাবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হিফজ করা। মনে রাখা দরকার, সালাত, সিয়াম, কাবার তওয়াফ কিংবা অন্যান্য নির্ভেজাল ইবাদত আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার মূল শর্ত হলো নিঃস্বার্থতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।

একইভাবে, আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম—যেমন আহার-পান, লেনদেন বা সামাজিক আচরণ—এসবকেও ইবাদতে রূপান্তর করতে হলে ইখলাস অপরিহার্য। কুরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ করা নিখাদ ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত, আর এই ইবাদত ইখলাস ছাড়া আল্লাহর নিকট কোনো মর্যাদা পায় না।

আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

অতএব যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।” (সূরা কাহাফ: ১১)

হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে:

আমি অংশীদারদের মধ্যে সবচেয়ে অমুখাপেক্ষী। যে আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করে কোনো আমল করে, আমি তাকে এবং তার আমল উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করি।” (মুসলিম – হা. ২৯৮৫)

অতএব কুরআন হিফজ বা তিলাওয়াত করার সময় লক্ষ্য থাকবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা প্রদর্শনীর ভাবনা থাকলে সেই আমল মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

২. কুরআনের মহত্ত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন

Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran
Gaining knowledge about the greatness and dignity of the Quran

কুরআন হিফজের প্রস্তুতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কুরআনের মহান মর্যাদা ও তার অমুল্য-মূল্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। এর মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো:

  • কুরআন আল্লাহর কালাম—এটি অন্তরে অনুভব করা ।
    কুরআন শুধুমাত্র একটি বই নয়, এটি আল্লাহর কালাম বা কথা। আমাদের অন্তরে এই উপলব্ধি জাগরিত রাখতে হবে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনে।” (সূরা তওবাহ্: ৬)
কুরআনের সম্মান আসলে আল্লাহর সম্মান; আল্লাহর সম্মান ছাড়া অন্য কোন সম্মান নেই। অতএব, আল্লাহর কালামের চেয়ে অধিক সম্মানিত কিছু নেই।

  • কুরআন নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট ভাবনা
    কুরআনকে আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতির জন্য হিদায়াত ও আলোকবর্তিকা হিসেবে নাজিল করেছেন। তিনি বলেন:

এটি (আল্লাহর) কিতাব, এতে কোন সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” (সূরা বাকারা: ২)
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেন:
রমযান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াত স্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।” (সূরা বাকারা: ১৮৫)

  • কুরআনের মর্যাদা ও সম্পর্কের কারণে সম্মান
    কুরআনের মর্যাদার ব্যাপারটি আরও স্পষ্ট হয় এর সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ের মাধ্যমে। যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে, সেই মাসের সম্মান অন্য মাসের চেয়ে অধিক। যে রাতে কুরআন নাজিল হয়েছে, সে রাতের সম্মান অন্য রাতের তুলনায় অতুলনীয়। যে নবীর ওপর কুরআন নাজিল হয়েছে, সে নবী পৃথিবীর অন্যান্য নবীদের তুলনায় মর্যাদাপূর্ণ। কুরআনের কারণে শেষ নবী, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সকল নবী-রাসূলের ইমাম ও আদম সন্তানের নেতা হয়েছেন। তিনি বলেন:

আমি আদম সন্তানের সরদার, এতে কোন অহঙ্কার নেই।”
আর যে ব্যক্তি কুরআন শিক্ষা করবে এবং তা অন্যদের শেখাবে, তার মর্যাদা হবে সবার চেয়ে উচ্চতর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
তোমাদের মধ্যে সেরা সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শেখায়।” (বুখারি)

  • কুরআনের প্রশংসা
    আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনের প্রশংসা করে বলেন:

আর আমি তো তোমাকে দিয়েছি পুনঃপুনঃ পঠিত সাতটি আয়াত ও মহান কুরআন।” (সূরা হিজর: ৮৭)

৩. কুরআন হিফজের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে হাফেজে কুরআনের ফজিলত ও সওয়াবের জ্ঞান লাভ

Preparing to become a Hafiz
Preparing to become a Hafiz

কুরআন হিফজের পথে প্রবাহিত হওয়ার পূর্বে, হাফেজে কুরআনের অসীম ফজিলত ও সওয়াব সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত রয়েছে কিছু অমূল্য কথা:

  • ওমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা’য়ালা এ কিতাবের মাধ্যমে একটি জাতির উত্থান ঘটান এবং অপর একটি জাতির পতন নিশ্চিত করেন।” (মুসলিম: ১:৫৫৯, হা.৮১৭)

হাদীসটি একুটু ব্যাখ্যা করি:

এখানে মূলত কুরআনের শিখন এবং তার অনুসরণ করার মাধ্যমে জাতির উন্নতি বা অবনতি সম্পর্কিত এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। যারা কুরআনকে মেনে চলবে, তারাই সম্মান, শক্তি, উন্নতি এবং ক্ষমতা লাভ করবে। আর যারা কুরআনকে অবজ্ঞা করবে বা উপেক্ষা করবে, তারা পতন এবং দুর্দশায় পতিত হবে।

এটি একটি মহামূল্যবান শিক্ষা যে, কুরআন আমাদের জীবনের পথনির্দেশক, এবং এর অনুসরণ করলে জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধি সম্ভব। তবে যদি কুরআনের নির্দেশনা থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তারা পতন ও অবনতির দিকে এগিয়ে যাবে।

এ হাদিসটি আমাদেরকে কুরআনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং এর অনুসরণ করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

 

  • ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে, তাকে একটি নেকি দেওয়া হবে, এবং প্রতিটি নেকি দশটি নেকির সমান হবে। আমি বলছি না যে, الم একটি হরফ, বরং ألف একটি হরফ, لام একটি হরফ, মিম একটি হরফ।” (তিরমিজি: ৫:৭৫, হা.২৯১)
  • আকবা বিন আমের রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    তিনি বলেন, “আমরা সুফফায় বসে ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন এবং বললেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি চান যে প্রতিদিন বাতহা বা আকিক নামক স্থানে গিয়ে অপরাধ বা সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়াই বিনা পরিশ্রমে দুটি বড় উট পেয়ে আসুক? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমরা সবাই তা পছন্দ করি। তিনি বললেন, তোমরা কি মসজিদে এসে প্রতিদিন দুটি আয়াত শিখতে কিংবা তিলাওয়াত করতে পারো না? এটি তোমাদের জন্য দুটি উটের চেয়ে উত্তম।” (মুসলিম: ১:৫৫২, হা.৮,৩)
  • আবু উমামা বাহিলি রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর, কারণ কুরআন কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে।‘” (মুসলিম: ১:৫৫৩, হা.৮,৪)
  • আবদুল্লাহ বিন আমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “হাফেজে কুরআনকে বলা হবে, ‘পড়ো এবং উচ্চে ওঠো।তোমার পড়ার ধীরগতি অনুসারে তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে।” (আবু দাউদ: ২:৫৩, হা.১৪৬৪)
  • ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কুরআনে পারদর্শী ব্যক্তি তার কওমের ইমামতি করবে।” (মুসলিম: ১:৪৬৫, হা.৬৭৩)
  • আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কুরআনে পারদর্শী এবং নিয়মিত কুরআন পাঠ করে, সে সম্মানিত ফেরেশতাদের সঙ্গী। আর যে ব্যক্তি কষ্ট সত্ত্বেও কুরআন পাঠ করে, তার সওয়াব দ্বিগুণ হবে।” (বুখারি+ফাতহুল বারি: ৮:৬৯১, হা.৪৯৩৭)
  • আবু মুসা আশআরি রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত:
    রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে সে জামির ফলের মতো, যার ঘ্রাণ এবং স্বাদ উভয়ই চমৎকার। আর যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করে না, সে খেজুর ফলের মতো, যার ঘ্রাণ নেই, তবে স্বাদ চমৎকার।” (বুখারি, মুসলিম)
  • কুরআন তিলাওয়াত ও মনোযোগী শ্রবণ
    কুরআন হিফজের জন্য সবচেয়ে সহায়ক বিষয় হলো কুরআন তিলাওয়াত করা ও মনোযোগসহ কুরআন শোনা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব অধ্যয়ন করে, সালাত কায়েম করে এবং আল্লাহ যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না।” (সূরা ফাতির: ২৯)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর, কুরআন তার তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ করবে।” (মুসলিম: ১:৫৫৩, হা.৮,৪)

  • কুরআন শ্রবণের গুরুত্ব
    আল্লাহ তা’য়ালা কুরআন শ্রবণ করার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন:

আর যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক, যাতে তোমরা রহমত লাভ কর।” (আরাফ: ২,৪)
লাইস বিন সা’দ বলেন, “কুরআন শ্রবণকারীর মতো দ্রুত কারোর ওপর রহমত অবতীর্ণ হয় না।” (আরাফ: ২,৪)

৪. কুরআন হিফজের পূর্বে কুরআন পাঠ ও হিফজের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন

Establishing the rule of the Quran and implementing education
Establishing the rule of the Quran and implementing education

কুরআন হিফজের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করার সময়, তার পাঠ (তিলাওয়াত) এবং হিফজের মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে আমরা কিছু মূল বিষয় তুলে ধরছি:

  • সওয়াব ও মর্যাদার আশায় কুরআন পাঠ বা তিলাওয়াত
    কুরআন পাঠের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর ভালোবাসা ও মর্যাদা লাভ করা। যেমন আগেও আলোচনা করা হয়েছে, কুরআন তিলাওয়াত করলে প্রতিটি হরফের বদলে আল্লাহ তা’য়ালা অসীম পুরস্কার প্রদান করেন। এটি একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য, যা প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
  • কুরআনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার বাস্তবায়ন
    কুরআন পাঠের এক অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তার শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তার শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা। কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তা’য়ালা মানব জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেছেন। এই শিক্ষা জীবনের প্রতিটি দিকেই প্রভাব ফেলতে সক্ষম, যদি আমরা সেটি যথাযথভাবে অনুসরণ করি।
  • চিন্তা শক্তি ও বোধ-বুদ্ধির পরিশুদ্ধি
    কুরআন হলো সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানের উৎস। এটি পাঠ করার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাশক্তি ও বোধ-বুদ্ধি পরিশুদ্ধ হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

আমি প্রত্যেক বস্তুর সুস্পষ্ট বর্ণনাসহ আপনার প্রতি কুরআন অবর্তীর্ণ করেছি। আর আমি তোমার উপর কিতাব নাযিল করেছি প্রতিটি বিষয়ের স্পষ্ট বর্ণনা।” (সূরা নাহাল: ৮৯)
এটি প্রমাণ করে যে, কুরআন শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং সকল জ্ঞানের মূল উৎস, যা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই দিকনির্দেশনা প্রদান করে।

  • কুরআনকে সহজ করে দেওয়া
    আল্লাহ তা’য়ালা কুরআনকে মানুষের জন্য সহজ করেছেন, যাতে তারা তার মধ্যে নিহিত শিক্ষাকে গ্রহণ করতে পারে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

আর আমি তো কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য। অতএব, কোন উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?” (সূরা কামার: ১৭)
ইমাম কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ তাঁর ব্যাখ্যায় বলেন, “অর্থাৎ আমি কুরআনকে হিফজ করার জন্য সহজ করে দিয়েছি। যে ব্যক্তি কুরআন হিফজ করতে চায়, আমি তাকে সাহায্য করি। এখন প্রশ্ন হলো—এ জন্য কেউ আছো?”

৫. কুরআন মুখস্থ করার দৃঢ় ইচ্ছা থাকা

কুরআন হিফজের শুরু এবং তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দৃঢ় ইচ্ছা। যদি কেবল ইচ্ছা না থাকে, তবে হিফজ কেবল একটি আশা কিংবা স্বপ্ন হিসেবেই থেকে যাবে। তাই, কুরআনের অসীম মর্যাদা, হাফেজদের মর্যাদা, কুরআন শোনা ও তিলাওয়াতের সওয়াবের প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করা এবং এ ব্যাপারে নিজেকে উৎসাহিত করা জরুরি।

  • ব্যস্ততা কমিয়ে হিফজের প্রতি মনোযোগী হওয়া
    কুরআন হিফজের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘসময় ধরে মনোযোগ সহকারে অধ্যবসায় (তিলাওয়াত) করা। সুতরাং, অন্যান্য দুনিয়াবি ব্যস্ততা হ্রাস করে কুরআন হিফজে আত্মনিবেশ করা এবং এই পথের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:

আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন।” (সূরা আনকাবুত: ৬৯)

এটি প্রমাণিত যে, আল্লাহর পথে নিরলস প্রচেষ্টা চালানো একজন মুসলিমকে অবশ্যই সাফল্যের দিকে পরিচালিত করে। কুরআন হিফজের জন্যও এটি প্রযোজ্য—শুধু ইচ্ছা নয়, লাগাতার পরিশ্রম এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হবে।

মুদ্দাকথা: অবিরাম প্রচেষ্টায় সাফল্য

যে ব্যক্তি অবিরত চেষ্টা করে, সে নিশ্চিতভাবে তার লক্ষ্যে পৌঁছায়। প্রতিটি প্রচেষ্টা, প্রতিটি চাষ, একদিন তার ফল দেয়। যেমন পিঁপড়া, যে বারবার চেষ্টা করে, পড়ে যায়, আবার উঠেও চেষ্টা করে, কখনও থামে না—এটাই তার সফলতার মূল চাবিকাঠি। কুরআনের শিক্ষার্থীও এই পিঁপড়ার মতো হতে হবে। একে একে, বারবার চেষ্টা করে, হতাশ না হয়ে, প্রতিটি চেষ্টায় নতুন উদ্যম নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

  • প্রতিদিন কিছু সময় কুরআন হিফজের জন্য নির্ধারণ করা
    কুরআন হিফজের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো প্রতিদিন কিছু সময় নির্দিষ্ট করা, এবং তা নিয়মিতভাবে পালন করা। এটি যদি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেতে হয় তাহলে তো তাদের স্বতন্ত্র রুটিন অনুযায়ী হবে। তবে যারা ব্যাক্তিগত ভাবে হেফজ করতে চান তাদের জন্য যেমন—ফজর, আসর, মাগরিব বা যেকোনো উপযুক্ত সময়ে কুরআন পাঠ করা। তবে, মসজিদে কুরআন তিলাওয়াত করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ। যেমন পূর্বের একটি
  •  হাদিসে এসেছে:

“أفلا يغدوا أحدكم إلى المسجد”
এটি প্রমাণ করে যে, মসজিদে কুরআন পাঠের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মসজিদের কুরআন হিফজ করার উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া অন্য কোথাও সম্ভব নয়, তাই এই পরিবেশটি বজায় রাখা সবচেয়ে শ্রেয়। এখন তো বর্তমান যোগে অনেক উন্নত মানের উন্নত পরিবেশের হাফিজিয়াহ্ মাদরাসা বিদ্যামান রয়েছে । তাই টেনশন করার প্রয়োজন নেই।

দ্বিতীয়ত মসজিদের আরেকটি ফজিলত রয়েছে, আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা  আনহু থেকে বর্ণিত, যারা মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য জড়ো হয় এবং পরস্পর মিলে দাওর (শোনা-শুনি) করে, তাদের ওপর বিশেষ প্রশান্তি সাকিনা নাযিল হয়, তাদেরকে আল্লাহর রহমত ঢেকে নেয়, ফেরেশতাগণ তাদের বেষ্টন করে নেয় এবং আল্লাহ তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। (মুসলিম : ৪:২,৪৭, হা.২৬৯৯) অনেক সময় শরীর অলস ও উদ্দমহীন হয়ে পড়ে, তখন অপরের সঙ্গ চালিকা শক্তির ন্যায় কাজ করে এবং উৎসাহ প্রদান করে, যার ফলে কুরআন হিফজকারী আলস্য ত্যাগ করে পুনরায় হিফজে মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়।

৬. কুরআনে পারদর্শী একজন ভালো উস্তাদ গ্রহণ করা

ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, কেবলমাত্র মাসহাফ বা কুরআনের বই পড়া যথেষ্ট নয়; কুরআন শেখার জন্য এমন একজন উস্তাদ গ্রহণ করা জরুরি, যিনি পূর্বে কোন বিজ্ঞ উস্তাদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। সুলাইমান বিন মূসা রাহিমাহুল্লাহ একসময় বলেছিলেন, “কাগজের কুরআন থেকে কুরআন গ্রহণ করো না।” সাইদ তানুখি বলেন, “একসময় উস্তাদরা বলতেন, তোমরা কুরআন শিখো না খাতা থেকে, তোমরা কুরআন শিখো কুরআন থেকে।”

কুরআন শিক্ষার প্রকৃত পদ্ধতি হলো গভীর মনোযোগের সহিত শ্রবণ করা এবং মুখস্থ করা। ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু বলতেন, “আমি ৭০টিরও বেশি সুরা সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র জবান থেকে শিখেছি।” (বুখারি + ফাতহুল বারি: ৯:৪৬, হা.৫)

কিন্তু কুরআনের বাকি অংশ তিনি কীভাবে শিখেছেন? হাফেজ ইবনে হাজার রাহিমাহুল্লাহ তার বুখারি ব্যাখ্যায় বলেন, “তিনি (ইবনে মাসউদ) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিদের কাছ থেকে কুরআনের বাকি অংশ শিখেছিলেন।” (ফাতহুল বারি: ৯:৪৮)

কুরআন শেখার জন্য উস্তাদ গ্রহণ করা অপরিহার্য, এবং সরাসরি উস্তাদের কাছ থেকে কুরআন শিক্ষা করা অতীব জরুরি। সাহাবারা তাদের ছাত্রদের কুরআন শেখানোর জন্য তাদেরকে সেই সাহাবিদের কাছে প্রেরণ করতেন, যারা সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কুরআন শিখেছেন।

সাহাবি মা’দি কারিব রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, “আমরা সাহাবি আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহুর কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমাদেরকে সুরা শুআরা তিলাওয়াত করে শোনান।তিনি বললেন, ‘এ সুরা আমার কাছে নেই। তোমরা খাববাব বিন আরত এর কাছে যাও, তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এটি শিখেছেন।আমরা খাববাব বিন আরত এর কাছে গিয়ে সুরাটি তিলাওয়াত শুনলাম।” (মুসনাদ ৬:৩৪)

এছাড়া, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি বছর জিবরাইল আলাইহিস সালাম এর সঙ্গে কুরআন দাওর করতেন। যেই বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর তিনি জিবরাইল আলাইহিস সালামের সঙ্গে দুবার দাওর করেছেন। (বুখারি + ফাতহুল বারি: ৯:৪৩, হা.৪৯৯৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদের সরাসরি কুরআন শেখানোর জন্য উৎসাহিত করতেন। তিনি বলতেন:

তোমরা চারজন থেকে কুরআন শিখো:
১. ইবনে উম্মে আব্‌দ,
২. উবাই বিন কাব,
৩. আবু হুজাইফার গোলাম সালেম,
৪. মুয়াজ বিন জাবাল থেকে।” (মুসলিম: ৪:১৯১৩, হা.২৪৬৪)

কুরআন হিফজ করার জন্য যে কোন এক ছাপার কুরআন বাছাই নির্দিষ্ট করা। যেমন: হফেজিয়া কুরআন

. শেষ থেকে কুরআন হিফজ আরম্ভ করা।

বিশেষ করে ছোট বাচ্চা, দুর্বল স্মরণ শক্তি বা অপেক্ষাকৃত কম আগ্রহীদের ব্যাপারে এ পদ্ধতি অনুসরণ করা খুবই জরুরি। এর ফলে তারা অল্প সময়ে একটি সুরা মুখস্থ করতে পারবে, অন্য সুরার জন্য প্রস্তুতি নিবে ও উদ্যমী হবে।

. আল্লাহ তা’য়ালার নিকট স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি, হিফজ করা ও হিফজ ধরে রাখার জন্য তওফিক চাওয়া।

 

দ্বিতীয় পরিচ্ছদ : প্রতিদিন কিছু অংশ মুখস্থ করার জন্য একটি চার্ট তৈরী করা :

. হিফজের ছাত্রের জন্য জরুরি এক বৈঠকে যতটুকু অংশ হিফজ করা সম্ভব প্রথমে তার পরিমাণ নির্ধারণ করা, বেশি নির্ধারণ না করা। বিশেষ করে যখন হিফজ শুরু করা হয় বা যখন খুব আগ্রহ থাকে। এতে অলসতা কাছে ঘেসতে পারবে না এবং কম সময়ে মুখস্থ হওয়ার ফলে কুরআন ত্যাগ করার প্রবণতাও সৃষ্টি হবে না। বরং প্রতিদিনের রুটিন অনুযায়ী সে নিজকে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়। সে প্রত্যহ নির্ধারিত অংশ হিফজ করাই নিজের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য জ্ঞান করবে।

প্রচলিত কুরআন (মাসহাফে উসমানি) ভাল করে পড়তে সক্ষম না হলে, একজন শিক্ষকের নিকট হিফজ করার পূর্বে নির্ধারিত অংশ শিখে নেয়া।

. শব্দের উচ্চারণ নির্ভুল ও সঠিক রাখার জন্য কুরআন সামনে রাখা ও দেখে দেখে মুখস্থ করা।

এক এক আয়াত করে পড়া এবং পরবর্তী আয়াতের সাথে সংযোগ করা। এক আয়াত এক লাইন থেকে ছোট হলে দুআয়াত করে পড়া। মুখস্থ করার অংশ দুলাইন বা তিন লাইনের বেশি না বাড়ানো।

. হিফজের সময় আওয়াজ সামান্য উঁচু রাখা। কারণ, নিচু আওয়াজ অলসতা সৃষ্টি করে, আবার উচুঁ আওয়াজের ফলে ক্লান্তি আসে ও অপরের অসুবিধার কারণ হয়। এটা  স্বাভাবিক নিয়ম। কেউ যদি খুব একাগ্রতা ও নিবিঢ় চিত্তে নিচু আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করে, তবে কোন সমস্যা নেই। হ্যাঁ, জিহ্বার নাড়াচাড়া আবশ্যক। জিহ্বার নাড়াচাড়া ব্যতিত শুধু চোখ বুলানো যথেষ্ট নয়।

. হিফজের সময় আয়াতের উচ্চারণ তারতীলসহ করা অর্থাৎ ধীরে ধীরে ও বিরতি দিয়ে পড়া। তাজবিদের আহকামে ভুল না করা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, তুমি কুরআন তারতিলসহ পড়। [সুরা মুজ্জাম্মেল : ৪] কুরআন দ্রুত মুখস্থ করার জন্য তাড়াহুড়া না করা, জিহ্বা দ্রুত নাড়াচাড়া না করা। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, কুরআন তাড়াতাড়ি আয়ত্ত করার উদ্দেশ্যে তুমি তোমার জিহ্বাকে দ্রুত আন্দোলিত করো না। [কিয়ামাহ : ১৬]

দ্বিতীয়ত : এ পদ্ধতিতেই রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম সাহাবাদের কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আর কুরআন আমি নাযিল করেছি কিছু কিছু করে, যেন তুমি তা মানুষের কাছে পাঠ করতে পার ধীরে ধীরে এবং আমি তা নাযিল করেছি পর্যায়ক্রমে। [বনি ইসরাইল : ১,৬]

একবার আনাস রাদিআল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামের কুরআন তিলাওয়াত কি রকম ছিল ? তিনি বলেন, টেনে টেনে পড়তেন, অতঃপর بسم الله الرحمن الرحيم  তিলাওয়াত করেন। তিনি বিসমিল্লাহ এর লা তে মদ করেন, আররাহমানে মা তে মদ করেন আররাহিমে হী তে মদ করেন। (বুখারি : ৯:৯১, হা.৫,৪৬)

এ নিয়মেই সাহাবায়ে কেরাম কুরআন তিলাওয়াত করতেন। একদা ইবনে আব্বাসের ছাত্র আবুহাজার বলেন, আমি খুব দ্রুত কুরআন তিলাওয়াত করতে পারি, আমি তিন দিনে কুরআন খতম করি। ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তা’য়ালা  আনহু তার প্রতিবাদ করে বলেন, চিন্তা, মনোযোগ ও তারতিলসহ এক রাতে শুধু সুরায়ে বাকারা পড়াই আমার কাছে উত্তম ও পছন্দনীয়, তোমার ন্যায় তিলাওয়াতের চেয়ে। অন্য বর্ণনায় আছে, প্যাঁচালের ন্যায় পড়ার চেয়ে। হিফজের সময় তারতিলসহ পড়ার ফলে চিন্তা ও গবেষণার সুযোগ হয়, সঙ্গে সঙ্গে আয়াতের অর্থ জানা যায় এবং হিফজও হয় সুদৃঢ়।

. নির্ধারিত অংশ মুখস্থ হলে নিজের কানে আওয়াজ পৌঁছে এমন উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করা।

. একবার না দেখে পড়ার পর পুনরায় দেখে পড়া, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, হিফজ ঠিক আছে, শব্দ-বাক্য বা জের-জবর-পেশে এর উচ্চারণগত কোন ভুল নেই।

. জরুরি ভিত্তিতে মুখস্থ অংশটুকু কোন অভিজ্ঞ উস্তাদকে পড়ে শোনানো।

১,. পূর্বে মুখস্থ অংশের সাথে পরবর্তী মুখস্থ অংশটুকু মিলিয়ে নেয়া। এভাবে প্রতিদিন মিলাতে থাকা।

 

তৃতীয় পরিচ্ছদ : হিফজ সমাপনের পর করনীয় :

হিফজ নিয়ে রিয়া বা লৌকিকতায় লিপ্ত না হওয়া।

আমাদের পরিভাষায় রিয়া দ্বারা উদ্দেশ্য : হিফজ সমাপনের পর বা বিশ্বমানের তিলাওয়াত ও শ্রুতি মধুর কণ্ঠের জন্য সম্মান ও মর্যাদার প্রত্যাশী থাকা, মানুষের অন্তরে আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা, যা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ের জিনিস হচ্ছে শিরকে আসগার। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল, শিরক আসগার তথা ছোট শিরক কি ? তিনি বললেন, রিয়া তথা লোক দেখানো আমল।

অতঃপর তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন যখন আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাদের আমলের প্রতিদান দিবেন, তখন রিয়াকারীদের বলবেন, তোমরা তাদের কাছে যাও, যাদের দেখানোর জন্য তোমরা আমল করতে, দেখ তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাওয়া যায় কি-না? (আহমাদ : ৫:৪২৮)

যে ব্যক্তি কুরআনকে নিয়ে রিয়াতে লিপ্ত হবে, সে নিজকে কঠিন আজাবের সম্মুখিন করবে। আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহুর হাদিসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, সর্ব প্রথম যাদের ব্যাপারে কিয়ামতের দিন ফয়সালা হবে, তার মধ্যে ঐ ব্যক্তি রয়েছে যে, ইলম শিক্ষা করেছে, অপরকে শিক্ষা দিয়েছে ও কুরআন তিলাওয়াত করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে, অতঃপর তার ওপর প্রদত্ত নেয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া হবে, সে তা স্বীকারও করবে। তাকে বলা হবে, তুমি এর ওপর কি আমল করেছ? সে বলবে, আমি ইলম শিক্ষা করেছি, অপরকে শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পড়েছি।

তাকে বলা হবে, তুমি মিথ্যে বলছ, বরং তুমি ইলম শিক্ষা করেছ, যাতে তোমাকে আলেম বলা হয়, কুরআন পড়েছ যাতে তোমাকে ক্বারি বলা হয়। অতঃপর তাকে চেহারার ওপর দাঁড় করিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেয়া হবে। (মুসলিম : ৩:১৫১৩, হা.১৯,৫) সুতরাং মুক্তি পেতে হলে, ইখলাস এবং নিয়ত ও উদ্দেশ্যকে পরিশুদ্ধ রাখা জরুরি।

কুরআন মোতাবেক আমল করা এবং সে অনুযায়ী আদব, আখলাক চরিত্রগঠন করা :

কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আমল করার জন্য ও কুরআন মোতাবেক জীবন পদ্ধতি পরিচালনা করার জন্য। ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলেন, তোমাদের আমলের জন্যে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, সুতরাং আমলের জন্য কুরআন পড়। তোমাদের কেউ কেউ পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করে, একটি হরফও বাদ পড়ে না, অথচ মোটেও সে কুরআন অনুযায়ী আমল করে না।

কতক বিজ্ঞজন বলেছেন, কেউ কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে নিজের ওপরই অভিসম্পাত বা অভিসাপ করে, অথচ সে জানেও না। যেমন কুরআনের অনেক জায়গায় রয়েছে অত্যাচারি তথা নিজেদের ক্ষতি সাধনকারীদের ওপর আল্লাহর লা’নত। অথচ কুরআনের ওপর আমল না করার কারণে সে নিজেই এর অন্তর্ভুক্ত। আবার সে তিলাওয়াত করে, মিথ্যুকদের ওপর আল্লাহর লা’নত। অথচ কুরআন অনুযায়ী আমল না করে সে নিজেও একজন মিথ্যুক। আনাস রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু বলেন, অনেক কুরআন পাঠকারী এমন রয়েছে, কুরআন যাদেরকে অভিসম্পাত বা  অভিসাপ করে।

 

নিজেকে নিয়ে অহংকারে লিপ্ত না হওয়া বা অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান না করা :

অহংকার বা অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করার অর্থ আল্লাহর করুনা বা তওফিকের কথা ভুলে নিজের কঠোর পরিশ্রম ও চেষ্টার ফলে হিফজ সমাপন সমাপ্ত হয়েছে মনে করা ও আত্মতুষ্টিতে লিপ্ত হওয়া। অথচ আল্লাহ তা’য়ালা তাকে হিফজের তওফিক দিয়েছেন, যদি তার অনুগ্রহ না হত, কখনো সে পূর্ণ কুরআন বা তার কিয়দাংশ মুখস্থ করতে সক্ষম হত না।

তাই হিফজের জন্য সর্বতভাবে আল্লাহ তা’য়ালার অনুগ্রহ স্বীকার করা, তার কৃতজ্ঞতা আদায় করা এবং শুধু তার দিকেই এ নেয়ামতের নিসবত করা জরুরি। মানুষের ওপর বড়ত্বের প্রকাশই অহংকার, এ থেকে বিরত থাকা। কারণ, মানুষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয় একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালার মেহেরবানীতে, তার করুনায়।

তাই অন্যদের মূর্খ ভাবা বা তুচ্ছজ্ঞান করার কোন সুযোগ নেই। যে এতে লিপ্ত হয়, তার হয়তো এর শাস্তির কথা জানা নেই। হাদিসে কুদসিতে রয়েছে, আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, অহংকার আমার চাদর, বড়ত্ব আমার পরিধেয় বস্ত্র, যে আমার এ বস্ত্র নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করব। (আবু দাউদ : ৪:৩৫,) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, যার অন্তরে সামান্য পরিমাণ অহংকার থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (মুসলিম ১:৯৩ হা.৯১)

কুরআন মুখাস্থ রাখার জন্য বারবার তিলাওয়াত করা এবং আগ্রহ সৃষ্টির জন্য ফযিলতপূর্ন হাদিস ইত্যাদি অধ্যয়ন করা। কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত ও তা ভুলে যাওয়ার ক্ষতি সম্পর্কে জানা।

যেমন:

  • ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, হাফেজে কুরআনের উদাহরণ উটের মালিকের ন্যায়, যদি সে তাকে বেঁধে রাখে, নিজ আয়ত্তে রাখতে পারবে, অন্যথায় সে চলে যাবে।(বুখারি ৯:৭৯ হা.৫,৩১)
  • সাহাবি আব্দুল্লাহ বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কারো এমন বলা যে, আমি অমুক আয়াত ভুলে গেছি, খুবই খারাপ। বরং তাকে ভুলানো হয়েছে। তার উচিৎ বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা। কারণ, কুরআন মানুষের হৃদয় থেকে উটের চেয়ে দ্রুত পলায়নপর।(বুখারি : ৯:৭৯, হা.৫৫৩২)
  • আবুমুসা রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেন, তোমরা বারবার কুরআন পড়, আল্লাহর কসম, যার হাতে আমার জান, রশি থেকে উটের পলায়ন করার চেয়েও কুরআন দ্রুত পলায়কারী।(বুখারি : ৯:৭৯, হা.৫,৩৩) এসব বর্ণনা ও অন্যান্য বর্ণনার ফলে আলেমগণ কুরআন খতমের কম মেয়াদ ও দীর্ঘ মেয়াদ ঠিক করে দিয়েছেন, যা অতিক্রম করা বৈধ নয়।

কম মেয়াদ : তিন দিন। আব্দুল্লাহ বিন আমর হতে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, যে তিন দিনের কমে কুরআন খতম করবে, সে কিছুই বুঝবে না। (আবু দাউদ : ২:১১৬, হা.১৩৯৪)

মুয়াজ বিন জাবাল রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু তিন দিনের কমে কুরআন খতম করা মাকরুহ বলতেন। (ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন) ইবনে মাসউদ রাদিআল্লাহু তা’য়ালা  আনহু বলতেন, তোমরা সাত দিনে কুরআন খতম কর, তিন দিনের কমে কুরআন খতম কর না। (ফাতহুল বারি : ৯:৯৭)

তিন দিনের কম কুরআন খতমে দ্রুত পড়ার দরুন চিন্তা-ফিকিরের সুযোগ থাকে না, বিরুক্তির উদ্রেক হয়, শব্দ উচ্চারণ (তালাফফুজ) সঠিক হয় না, তিলাওয়াতও সুন্দর হয় না ইত্যাদি। যে সকল আকাবের ও বুযর্গানে দ্বিনের ব্যাপারে বর্ণিত রয়েছে, তারা তিন দিনের কমে কুরআন খতম করেছেন, সম্ভবত তাদের নিকট আমাদের বর্ণিত হাদিসগুলো পৌঁছেনি বা দ্রুত পড়া সত্ত্বেও তারা কুরআনে মনোযোগ ঠিক রেখেছেন বা রমজান ইত্যাদির মত কোন ফজিলতপূর্ণ সময়ে তারা এমন করেছেন। তারা এ সময়কে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। এটা তাদের চিরাচরিত নিয়ম ছিল না।

কুরআন খতমের দীর্ঘ মেয়াদ : কুরআন খতমের দীর্ঘ মেয়াদ চল্লিশ দিন। আব্দুল্লাহ বিন আমর থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লামকে প্রশ্ন করেন, কত দিনে কুরআন খতম করব? তিনি বলেন, চল্লিশ দিনে। (তিরমিজি : ৫:১৯৭, হা.২৯৪৭)

এ হাদিসের কারণে ইসহাক ইবনে রাহওয়ে বলেন, চল্লিশ দিনের অধিক অতিবাহিত হবে, অথচ কুরআন খতম হবে না, এটা খুবই খারাপ। (তিরমিজি : ৫:১৯৭) তিনি আরো বলেন, চল্লিশ দিনের মধ্যে কুরআন খতম না করা মাকরুহ। (ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন)

গুনাহ নাফরমানির কারণে কুরআন চলে যায় :

হাদিসে রয়েছে গুনাহের কারণে মানুষ অনেক নেয়ামত হতে বঞ্চিত হয়, বিভিন্ন মুসিবতে গ্রেফতার হয়, যার মধ্যে বড় মুসিবত হচ্ছে কুরআন ভুলে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম বলেছেন, মানুষ সামান্য মুসিবত বা তার চেয়েও ছোট বা বড় মুসিবতে নিজ গুনাহের কারণেই পতিত হয়। আর আল্লাহ তা’য়ালা যেসব গুনা ক্ষমা করেন, তার পরিমাণ তো অনেক বেশি। (তিরমিজি : ৫:৩৭৭, হা.৩২৫২) কুরআন ভুলার ক্ষেত্রে গোনাই বেশি দায়ী। জাহহাক বিন মুজাহিম বলেন, যে কুরআন পড়ে ভুলে গেছে, সে মূলত নিজ গুনাহের কারণেই ভুলে গেছে। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন, আর তোমাদের প্রতি যে মুসীবত আপতিত হয়, তা তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল। আর অনেক কিছুই তিনি ক্ষমা করে দেন। [শুরা : ৩]

কুরআন ভুলা সব চেয়ে বড় মুসিবত:

(ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন) আগের যুগে যে কুরআন ভুলে যেত, সে খুবই কোনঠাসা হয়ে যেত। ইবনে সিরিন থেকে সহিহ সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে কুরআন ভুলে যেত তাকে তারা ঘৃনা করতেন, তার ব্যাপারে তারা কঠোর মন্তব্য করতেন। (ফাতহুল বারি : ৯:৮৬) এর কারণ হিসেবে কুরতুবি রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে পূর্ণ কুরআন বা তার কিয়দাংশ মুখস্থ করল, তার মর্যাদা অন্যদের তুলনায় বৃদ্ধি পেল, যদি সে মর্যাদার অবমাননা করে, অথবা মর্যাদা থেকে ছিটকে পড়ে, সে তিরস্কারের পাত্র। কুরআন না পড়ার অর্থ অজ্ঞতার শিকার হওয়া, শিক্ষা অর্জন করে অজ্ঞদের অর্ন্তভুক্ত হওয়া সামান্য বিষয় নয়। (ফাতহুল বারি : ৯:৮৬)

কারো মতে কুরআন ভুলে যাওয়া মারাত্বক গুনা। আবুল আলিয়া আনাস রাদিআল্লাহু তা’য়ালা আনহু থেকে বর্ণনা করেন, আমরা সব চেয়ে বড় গুনাহ মনে করতাম, কুরআন পড়ে অলসতা বা গাফলতির কারণে ভুলে যাওয়া। (ফাতহুল বারি : ৯:৮৬) ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, কতক আলেম কুরআন ভুলে যাওয়া ব্যক্তিকে কুরআন বিমূখ ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করে এ আয়াতের অর্ন্তভুক্ত জ্ঞান করেছেন, আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য  হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়।

সে বলবে, হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? [তহা : ১২৪-১২৫] আল্লাহ বলবেন, তিনি বলবেন, এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলী এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। [তহা : ১২৬] সামান্য হলেও সে এ আয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কারণ, কুরআন তিলাওয়াত না করা, তার ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করা, সেচ্চায় ভুলে যাওয়ারই শামিল, যা মারাত্বক অপরাধ। (ইবনে কাসির : ফাজায়েলে কুরআন)

 

. কুরআন মুখস্থ রাখার পদ্ধতি:

কুরআন মুখস্থ রাখার জন্য সব চেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে, প্রতি দিন নির্দিষ্ট সময়ে তওফিক মোতাবিক তিলাওয়াত করা। যাদের পক্ষে তা সম্ভব নয়, তারা নিম্নের পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে :

()

  • এক পারা আট ভাগ করে নেয়া : ফজরের সুন্নত ব্যতীত অন্যান্য সুন্নতে মুয়াক্কাদাতে প্রতি দুরাকাতে একঅষ্টমাংশ পড়া। (জোহরের আগে-পরে সুন্নতে তিন অংশ, মাগরিবের সুন্নতে এক অংশ, এশার সুন্নতে এক অংশ, এভাবে আট অংশের পাঁচ অংশ পড়া হয়ে যাবে।)
    • আসরের আগে দুরাকাত সালাতে এক অংশ পড়া। (এক অষ্টমাংশ)
    • ফরজ সালাতে ও তাহাজ্জুদের সালাতে দুই অংশ পড়া। (দুই অষ্টমাংশ) এভাবে প্রতি দিন সর্ব নিম্ন এক পারা অবশ্যই তিলাওয়াত করা।

() নফল নামাজে, গাড়িতে, আজান-একামাতের মাঝখানে, বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে, অফিসে যাওয়ার পথে এবং আসার সময়… আরো অন্যান্য সময়ে কুরআন তিলাওয়াত করা।

(ফজর নামাজের পরে সামান্য সময়ের জন্যে হলেও কুরআন পড়তে বসা, অন্তত পক্ষে এক অষ্টমাংশ তিলাওয়াত করা।

() আরো উঁচু হিম্মত সম্পন্ন লোক মনজিল পদ্ধতিতে এক সপ্তাহে পূর্ণ কুরআন খতম করতে পারেন, নিম্নের বিন্যাস অনুসারে মাশায়েখ ও ওলামায়ে কেরামরা কুরআন খতম করতেন :

  • প্রথম দিনের পরিমাণ :সুরায়ে ফাতেহা থেকে সুরায়ে মায়েদার আগ পর্যন্ত।
  • দ্বিতীয় দিনের পরিমাণ :সুরায়ে মায়েদা থেকে সুরায়ে ইউনুসের আগ পর্যন্ত।
  • তৃতীয় দিনের পরিমাণ :সুরায়ে ইউনুস থেকে সুরায়ে মারইয়ামের আগ পর্যন্ত।
  • চতুর্থ দিনের পরিমাণ :সুরায়ে মারইয়াম থেকে সুরায়ে শুআরার আগ পর্যন্ত।
  • পঞ্চম দিনের পরিমাণ :সুরায়ে শুআরা থেকে সুরায়ে সাফ্‌ফাতের আগ পর্যন্ত।
  • ষষ্ট দিনের পরিমাণ :সুরায়ে সাফ্‌ফাত থেকে সুরায়ে কাফ এর আগ পর্যন্ত।
  • সপ্তম দিনের পরিমাণ :সুরায়ে কাফ থেকে সুরায়ে নাস এর শেষ পর্যন্ত।

আলাদা আলাদা এ পরিমাণ স্মরণ রাখার জন্য (فمي مشوق ) শব্দটি মুখস্থ রাখা যায়। ف দ্বারা সুরায়ে ফাতেহার শুরু, م দ্বারা সুরায়ে মায়েদার শুরু, ي দ্বারা সুরায়ে ইউনুসের শুরু, م দ্বারা সুরায়ে মারইয়ামের শুরু, ش দ্বারা সুরায়ে শুআরার শুরু, و দ্বারা সুরায়ে সাফ্‌ফাতের শুরু, ق দ্বারা সুরায়ে ক্বাফ এর শুরু। যার দশ পারার কম মুখস্থ তার উচিত পুরো মুখাস্থ অংশ প্রতি পনের দিন অন্তর একবার অবশ্যই পড়া। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তওফিক দিন। আমীন। ছুম্মা আমীন।
এখনই কুরআন হিফজের যাত্রা শুরু করুন! আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই পবিত্র যাত্রায় অংশ নিন এবং প্রতিদিন কিছু সময় নির্ধারণ করে আপনার লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে যান। আপনার জীবনে কুরআনকে আনার জন্য আজ থেকেই প্রস্তুতি নিন। হিফজের জন্য সঠিক পদ্ধতি জানুন এবং আপনার অগ্রযাত্রা শুরু করুন। এসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কনটেন্ট পেতে নিয়মিত টিসি-কম্পিউটার ভিজিট করুন।

Table of Contents

হিফজ সম্পন্ন করার কৌশল
হিফজ সম্পন্ন করার কৌশল: হিফজ ছাত্রের অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য | হিফজ টিপস

হিফজ সম্পন্ন করার কৌশল: হিফজ ছাত্রের অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য | হিফজ টিপস হিফজের পথে একজন ছাত্র আল্লাহর কালামকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করে এবং এটি কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় অভ্যাস নয়,

হিফজ সম্পন্ন করার কৌশল: হিফজ ছাত্রের অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য | হিফজ টিপস

হিফজ সম্পন্ন করার কৌশল
হিফজ সম্পন্ন করার কৌশল: হিফজ ছাত্রের অভিভাবকের দায়িত্ব ও কর্তব্য | হিফজ টিপস

হিফজের পথে একজন ছাত্র আল্লাহর কালামকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করে এবং এটি কেবলমাত্র একটি ধর্মীয় অভ্যাস নয়, বরং একটি মহান দায়িত্ব। হিফজ ছাত্রদের জন্য কুরআন মুখস্থ করা একটি দীর্ঘ, কঠিন, তবে অত্যন্ত পুরস্কৃত যাত্রা। কিন্তু এই পথটি পাড়ি দিতে শুধুমাত্র অধ্যবসায়, কঠোর পরিশ্রম, এবং আল্লাহর উপর বিশ্বাসই যথেষ্ট নয়—এখানে একজন অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

তারা কীভাবে সাহায্য করতে পারেন? তাদের ভূমিকা কেবলমাত্র সহানুভূতি বা প্রেরণা দেওয়া নয়, বরং একটি পরিপূর্ণ সমর্থনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা সন্তানের শিক্ষাগত এবং মানসিক উন্নতির সাথে সঙ্গতি রেখে চলবে।

এখানে আমরা হিফজ ছাত্রদের অভিভাবকদের দায়িত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করছি, পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ টিপস এবং কৌশলের উদাহরণ তুলে ধরছি যা এই পথে অভিভাবকদের সাহায্য করবে। তো চলুন শুরু করি।

১. ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা

Creating an environment for religious education
Creating an environment for religious education

একজন হিফজ ছাত্রের জন্য তার পরিবারের পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তত পক্ষে সন্তান যখন মাদরাসা থেকে বাড়ীতে ছুটিতে আসেবে। ঘরটি যেন ইসলামিক পরিবেশে পরিপূর্ণ থাকে, আর যদি সব সময়ের জন্য এই পরিবেশটি তৈরি করে নিতে পারেন, তাহলে তো ভালই-ভালো। কারণ এটি তার কুরআন হেফজের প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে তুলবে। পরিবারে ইসলামিক মূল্যবোধ, নিয়মিত নামাজ এবং কুরআন তিলাওয়াতের পরিবেশ তাকে আরো উৎসাহিত করবে এবং আল্লাহর কালামের প্রতি তার ভালবাসা গভীর হবে।

উদাহরণ:

  • প্রতিদিন ফজরের নামাজ শেষে পুরো পরিবার একসাথে ১৫-৩০ মিনিট কুরআন তিলাওয়াত করলে এটি হিফজ ছাত্রের জন্য বিশাল উৎসাহ প্রদান করতে পারে।
  • পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ইসলামী আলোচনার আয়োজন করতে পারেন, যাতে হিফজ ছাত্রের মধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও প্রেম বেড়ে যায়।
  • বিশ্ব বিখ্যাত হাফেজদের তিলাওয়াত ও জীবনবৃত্তান্ত শুনাবেন ।

টিপস:

  • অভিভাবকরা নিজেদের উপরও কুরআন তিলাওয়াত এবং ইসলামী আলোচনা নিয়মিত করে একটি পরিবেশ তৈরি করবেন, যা তাদের সন্তানকে উৎসাহিত করবে।

২. নিয়মিত পুনরাবৃত্তি নিশ্চিত করা

Ensuring regular repetition
Ensuring regular repetition

কুরআন মুখস্থ করার পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি ধরে রাখা। অধিকাংশ সময়, মুখস্থ করা আয়াতগুলো ভুলে যাওয়ার শঙ্কা থাকে যদি নিয়মিত মুরাজাআ (পুনরাবৃত্তি Revision) না করা হয়। অভিভাবকদের উচিত, সন্তানদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রিভিশন সিডিউল তৈরি করা, যাতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট আয়াত বা পারা পুনরাবৃত্তি হয়। পুনরাবৃত্তি ছাড়া কুরআন হেফজ করা এক সময় ভুলে যেতে পারে, তাই এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

টিপস:

  • প্রতিদিন ৩০ মিনিট সময় করে পুনরাবৃত্তি (Repeat reading) করুন, সকালে বা সন্ধ্যায়।
  • একটি হিফজ রুটিন তৈরি করুন এবং এতে প্রতিদিন পুনরাবৃত্তি করা আয়াতের পরিমাণ নির্ধারণ করুন।
  • মাদ্রাসার পর অবসর সময়ে সন্তানদের সাথে কুরআনের কিছু আয়াত শুনুন, যাতে তাদের মুরাজাআ’র প্রতি আগ্রহ বাড়ে।

৩. শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা খেয়াল রাখা

Taking care of physical and mental health
Taking care of physical and mental health

কুরআন হেফজের পথে অনেক সময় ছাত্ররা শারীরিক বা মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে তিলাওয়াত করার ফলে তাদের শারীরিক শক্তি কমে যেতে পারে, তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানের বিশ্রাম, সুষম খাদ্য এবং মনের শান্তি নিশ্চিত করা। এটি তাদের হিফজের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠবে।

উদাহরণ:

  • যদি সন্তান ক্লান্তি বা হতাশা অনুভব করে, তবে তাকে খেলাধুলা করার সুযোগ দিন অথবা পরিবারিক গল্প শোনান, যা তার মানসিক চাপ কমাবে।
  • কিছু সময় বাইরে হাঁটতে নিয়ে যান অথবা তাকে এমন কিছু করতে উৎসাহিত করুন, যা তাকে শারীরিকভাবে সতেজ রাখবে।

৪. ইসলামী আদর্শে সন্তানদের গড়ে তোলা

Raising children in Islamic ideals
Raising children in Islamic ideals

একজন অভিভাবক সন্তানের জন্য প্রথম শিক্ষাগুরু। সন্তানের সামনে ইসলামী আদর্শের অভ্যাস গড়ে তুলতে অভিভাবকরা তাদের আচরণ, কথা-বার্তা, এবং দৈনন্দিন কার্যকলাপে ইসলামী আদর্শ বজায় রাখবেন। তাদের মধ্যে সদাচারণ, নম্রতা এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস দৃঢ় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

টিপস:

  • আল্লাহর নাম বেশি বেশি উচ্চারণ করুন এবং সন্তানদের মধ্যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করুন।
  • পরিবারে সুন্নাহ মেনে চলার চেষ্টা করুন, যাতে সন্তানরাও তা শিখতে পারে।
  • ইসলামী কাহিনী শোনান যা সন্তানদের মনোবল ও ইমানী চেতনা বৃদ্ধি করবে।

৫. একাডেমিক শিক্ষায় সহায়তা করা

Supporting academic education
Supporting academic education

হাফেজ ছাত্রদের শুধু হিফজ সম্পন্ন করাতেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাদের একাডেমিক পড়াশোনা ও সাধারণ শিক্ষা-ব্যবস্থাতেও সহায়তা করা জরুরি। একাডেমিক শিক্ষায় সফল হওয়া তাদের ভবিষ্যতের জন্য সহায়ক হবে এবং এটি তাদের ইসলামিক দায়িত্ব পালনেও সাহায্য করবে।

উদাহরণ:

  • একাডেমিক শিক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করা একজন হাফেজ ছাত্রকে দাওয়াত ও সমাজের জন্য আরও কার্যকরী হতে সহায়তা করবে।
  • ভালো একটি একাডেমিক মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে যোগ্য আলিম বানান। সম্ভব হলে উচ্চতর শিক্ষা দেওয়ার জন্য ইফতা, তাফসীর, তাখাসসুস ফি উলূমিল হাদীস পড়ান।

এক্রট্রা টিপ্স: যদি পসিবল হয় একাডেমিক সিলেবাসের পাশাপাশি তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা স্কলারশিপ প্রক্রিয়ার জন্য সহায়তা করুন।

৬. মাদ্রাসার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা

Maintain regular contact with the madrasa
Maintain regular contact with the madrasa

মাদ্রাসার শিক্ষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে সন্তানের অগ্রগতি ও সমস্যাগুলি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের উপস্থিতি, শিক্ষকের সাথে সন্তানের অগ্রগতি এবং যদি কোনো সমস্যা থাকে তা দ্রুত সমাধান করা।

টিপস:

  • প্রতি মাসে মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষকদের সাথে সন্তানের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করুন।
  • মাদ্রাসার কোনো অনুষ্ঠান বা সভায় অংশগ্রহণ করুন, যাতে আপনি তাদের পরিবেশ এবং শিক্ষাদান প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও জানতে পারেন।

৭. ধৈর্য এবং দোয়া করা

Patience and prayer
Patience and prayer

হিফজের পথে অনেক সময় সন্তানের উদ্যম কমে যেতে পারে। তখন অভিভাবকদের উচিত ধৈর্য ধরতে এবং আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য দোয়া করা। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা ও সন্তানদের জন্য দোয়া করলে এটি তাদের পথকে আরও সহজ করে তোলে।

উদাহরণ:

  • তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে সন্তানদের জন্য দোয়া করা একজন অভিভাবকের জন্য একটি শক্তিশালী উপায় হতে পারে।

মুদ্দাকথা: অবিরাম প্রচেষ্টায় সাফল্য

যে ব্যক্তি অবিরত চেষ্টা করে, সে নিশ্চিতভাবে তার লক্ষ্যে পৌঁছায়। প্রতিটি প্রচেষ্টা, প্রতিটি চাষ, একদিন তার ফল দেয়। যেমন পিঁপড়া, যে বারবার চেষ্টা করে, পড়ে যায়, আবার উঠেও চেষ্টা করে, কখনও থামে না—এটাই তার সফলতার মূল চাবিকাঠি। কুরআনের শিক্ষার্থীও এই পিঁপড়ার মতো হতে হবে। একে একে, বারবার চেষ্টা করে, হতাশ না হয়ে, প্রতিটি চেষ্টায় নতুন উদ্যম নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

উপসংহার:

হাফেজদের অভিভাবকরা সন্তানের জন্য এক মহান গাইডের ভূমিকা পালন করেন। কুরআন হেফজের মহান দায়িত্ব পালনে অভিভাবকদের ভালোবাসা, সহানুভূতি, দোয়া এবং প্রচেষ্টা সন্তানের জন্য আলোর পথ হয়ে উঠবে। আল্লাহ আমাদের সকলের সন্তানদের কুরআনের পথে পরিচালিত করুন এবং তাদেরকে দ্বীনের দায়িত্ব পালনের তৌফিক দিন।

এই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে আল্লাহ আমাদেরকে সাহায্য করুন। আমিন।

পিআর পদ্ধতির সুবিধা
পি আর (PR) পদ্ধতি কি?: সুবিধা, অসুবিধা এবং ভবিষ্যৎ

পি আর পদ্ধতি কি? (PR) সুবিধা, অসুবিধা এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক বিতর্ক বর্তমানে একটি গরম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত, “আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব Proportional Representation (PR)”

পি আর পদ্ধতি কি? (PR) সুবিধা, অসুবিধা এবং ভবিষ্যৎ

পিআর পদ্ধতির সুবিধা
পি আর (PR) পদ্ধতি কি?: সুবিধা, অসুবিধা এবং ভবিষ্যৎ

বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত রাজনৈতিক বিতর্ক বর্তমানে একটি গরম বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত, “আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব Proportional Representation (PR)” পদ্ধতির প্রবর্তন নিয়ে চলমান আলোচনা ও সমালোচনা অনেকের নজর কেড়েছে। নির্বাচনে আসন বণ্টন কিভাবে হবে—এই প্রশ্ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর সাথে বিএনপির মধ্যে এ নিয়ে চলা তীব্র বিতর্কের কারণে পিআর পদ্ধতির প্রতি জনমনে আগ্রহও বেড়েছে। কিন্তু আসলে এই পিআর পদ্ধতি কী, কেন এটি প্রয়োজন, এবং বাংলাদেশের জন্য এটি কতটা উপযোগী—এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি।

পিআর পদ্ধতি কী?

প্রথমেই জানি, “আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব Proportional Representation (PR)” পদ্ধতি হচ্ছে একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন পায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি নির্বাচনে কোনো দল যদি ১০% ভোট পায়, তবে সেই দল সংসদের ১০% আসন পাবেন। এটা সাধারণত ভোটারদের মতামতকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করে।

প্রচলিত ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট” (FPTP) পদ্ধতির তুলনায়, যেখানে এক প্রার্থী এককভাবে বেশি ভোট পেলে জিতে যান, PR পদ্ধতিতে এমন পরিস্থিতি নেই। এতে ভোটের প্রতিটি শতাংশই মূল্যবান হয়, এবং প্রতিনিধিত্ব অনেক বেশি ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।

পিআর পদ্ধতির প্রবর্তন বিশ্বব্যাপী ব্যবহার

এই পদ্ধতি প্রথম ১৮৯৯ সালে বেলজিয়ামে চালু হয়। বর্তমানে বিশ্বের ১৭০টি গণতান্ত্রিক দেশের ৯১টি দেশ PR পদ্ধতি ব্যবহার করে। উন্নত দেশের মধ্যে ৭০% দেশেই এই পদ্ধতি প্রয়োগ হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোও কিছুদিন ধরে এটি নিয়ে আলোচনা করছে। বিশেষ করে ইসলঅমী আন্দোলন, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টিসহ আরো কিছু দল পিআর পদ্ধতির সমর্থক, যদিও বিএনপি এর বিরোধী।

কেন পিআর পদ্ধতি প্রয়োজন?

বাংলাদেশের বর্তমান নির্বাচনী পদ্ধতিতে অনেক সময় দেখা যায় যে, কোনো দল অনেক কম ভোট পেয়ে অধিকাংশ আসন পেয়ে যায়, এবং বড় দলগুলোর ভোটের কোনো প্রতিফলন ঘটে না। ধরুন, একটি দল ২৫% ভোট পেলেও পুরো সংসদের অধিকাংশ আসন তারা জিতে নেয়। এমন পরিস্থিতিতে একটি বৈষম্য তৈরি হয়, যেখানে জনপ্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য থাকে না। পিআর পদ্ধতির মাধ্যমে, এমন অসঙ্গতি দূর করা সম্ভব, এবং সব দলেই সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়।

উদাহরণ:

ধরা যাক, একটি নির্বাচনে ৪টি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। যদি একটি দল ২৫% ভোট পায়, তবে তাদের ২৫% আসন মিলবে, এবং বাকি ৭৫% ভোট পাওয়া দলগুলোও কিছু আসন পাবে। এতে ছোট দলগুলোও সংসদে প্রতিনিধিত্ব পাবে, যা FPTP পদ্ধতিতে সম্ভব নয়।

পিআর পদ্ধতির সুবিধা

১. বড় ছোট দলের মধ্যে ভারসাম্য: ছোট দলগুলোও প্রতিনিধিত্ব পায়, যাতে তারা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

২. সংখ্যালঘু নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি: ছোট দলগুলো বা নারী প্রার্থীরা তাদের ভোটের হারে আসন পেয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন।

৩. হারানো ভোট কমে যায়: প্রচলিত পদ্ধতিতে অনেক ভোটের কোন মূল্য থাকে না, কিন্তু PR পদ্ধতিতে প্রতিটি ভোটের মূল্য রয়েছে।

পিআর পদ্ধতির অসুবিধা

১. সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভাব: PR পদ্ধতিতে প্রার্থীরা সরাসরি জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেন না, তাই জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে।

২. রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা: জোটভিত্তিক রাজনীতি বাড়াতে পারে, যা কখনও কখনও সরকার পরিচালনায় অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

৩. দুর্নীতির সম্ভাবনা: বড় বা প্রভাবশালী দলগুলো তাদের প্রার্থীদের মাধ্যমে জয় লাভ করতে পারে, যা ক্ষমতার অপব্যবহারকে বাড়িয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশে পিআর পদ্ধতি বাস্তবসম্মত?

বাংলাদেশের সংবিধানে পিআর পদ্ধতি সরাসরি নিষিদ্ধ নয়, তবে এটি প্রয়োগ করতে হলে জাতীয় ঐকমত্য ও আইন সংশোধন প্রয়োজন। নির্বাচনে নতুন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা, যেমন পিআর পদ্ধতির প্রবর্তন, ভোটের প্রভাব এবং সাংবিধানিক বাধা—এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা জরুরি। কিছু রাজনৈতিক দল পিআর পদ্ধতিকে সমর্থন করছে, আবার কিছু বিরোধী দল এটি গ্রহণ করতে রাজি নয়। তাই, একটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসা দেশটির গণতন্ত্রের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

উপসংহার

বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্বাচনী ব্যবস্থার উন্নতির জন্য পিআর পদ্ধতির আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ, প্রতিনিধিত্বমূলক ও ন্যায্য নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। তবে, এমন একটি পরিবর্তন কার্যকর করার জন্য রাজনৈতিক ঐক্যমত্য ও আইনগত সংশোধন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে, সঠিক পদ্ধতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের স্বার্থ বজায় রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Tc-Computer মনে করে, ভবিষ্যতের নির্বাচনে জনগণের মতামত এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিফলন নিশ্চিত করার জন্য পিআর পদ্ধতি একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। তবে, এর বাস্তবায়ন শুধুমাত্র ঐকমত্যের মাধ্যমেই সম্ভব।

زلف محمّد کا ترنّم
زلف محمّد کا ترنّم

زلف محمّد کا ترنّم واللّیل میں ہے زلف محمّد کا ترنّم والشّمس میں رخسارۂ احمد کا ترنّم والفجر میں ہے صبح رسالت کی بِشارت والعصر میں ہے دور نبوت کی

زلف محمّد کا ترنّم

زلف محمّد کا ترنّم
زلف محمّد کا ترنّم

واللّیل میں ہے زلف محمّد کا ترنّم

والشّمس میں رخسارۂ احمد کا ترنّم

والفجر میں ہے صبح رسالت کی بِشارت

والعصر میں ہے دور نبوت کی بِشارت

ہر پھول میں ہے روئے مدینہ کا تبسّم

شاخوں کی لچک میں قدِ آقَا کا تکلّم

یٰس سے مولانے کبھی اسکو پکارا

حم کبھی اور کبھی طس اشارہ

یہ رمز ہے کچھ عاشق و معشوق  کی ما بین

سمجھا ہے جنھیں خلق میں اک سرور کونین

افلاک میں ہے احمدی افکار کی وسعت

دریائے تلاطم میں عیا عشق کیحرکت

والنّجم میں ہے برق نگہ اسکی نمودار

والارض میں بھی صبر و تحمّل کے ہیں آثار

قرآن عجب شیشۂ اخلاق نبی ہے

کَوکب کو یہی فخر کہ وہ مصطفوی ہے

ناصر کو یہی فخر کہ وہ مصطفوی ہے

ইসলামের রাজনৈতিক ধারণা
ইসলামে রাজনীতির স্থান দীন ও রাজনীতির সম্পর্ক

ইসলামে রাজনীতির স্থান: দীন ও রাজনীতির সম্পর্ক ভূমিকা: ইসলামে রাজনীতির স্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর আলোচনা। বর্তমান সমাজে যখন ধর্ম এবং রাজনীতি একে অপর থেকে পৃথক করে দেখতে চাওয়া

ইসলামে রাজনীতির স্থান: দীন ও রাজনীতির সম্পর্ক

ইসলামের রাজনৈতিক ধারণা
ইসলামে রাজনীতির স্থান দীন ও রাজনীতির সম্পর্ক

ভূমিকা:
ইসলামে রাজনীতির স্থান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর আলোচনা। বর্তমান সমাজে যখন ধর্ম এবং রাজনীতি একে অপর থেকে পৃথক করে দেখতে চাওয়া হয়, তখন ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইসলামের শিক্ষা মানব সমাজের সর্বস্তরের জন্যে সমান এবং রাজনীতি তার অন্তর্ভুক্ত। খ্রিষ্টান বা সেক্যুলার দর্শন যেখানে ধর্মকে রাজনীতির থেকে আলাদা করতে চায়, ইসলামে তা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামে রাজনীতি শুধুমাত্র একটি শাখা নয়, বরং এটি দীন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি উপায় ও মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। এই প্রবন্ধে, আমরা ইসলামে রাজনীতির প্রকৃত অবস্থান এবং এর সাথে সম্পর্কিত ভ্রান্ত ধারণাগুলির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করব।

ইসলামে রাজনীতির স্থান

সর্বপ্রথম বিষয় হলো ইসলামে রাজনীতির স্থানটি কোথায়? ইসলামে একটি সহীহ্ দল গঠনের গুরুত্ব কতখানি? খ্রিষ্টানদের এ ভণ্ড চিন্তাধারাটা খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, ‘কায়সারের অধিকার কায়সারকে দাও, গীর্জাকে দাও গীর্জার অধিকার’। যার সারমর্ম হলো এই— রাজনীতিতে ধর্মের কোন বালাই নেই। ধর্মের নিবাস ধর্মজগতে; রাজনীতির অবস্থান রাজনীতির ক্ষেত্রে। সবাইকে নিজ নিজ পরিমণ্ডলে থেকে কাজ করা চাই। একে অন্যের ছকে ঢুকে পড়া অবাঞ্ছিত। দীন ও রাজনীতির এ বিভক্তি-ভাবনাই পরবর্তীকালে সেক্যুলারিজম-এর রূপ পরিগ্রহণ করে- যা বর্তমান রাজনীতির দুনিয়ায় সমধিক সমাদৃত ।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ইসলামে এ ধরনের ভাবনার কোন অবকাশ নেই। যেহেতু ইসলামের শিক্ষা মানব সমাজের সর্বস্তরের ও সর্বক্ষেত্রের জন্যে সমান, তাই রাজনীতিও তার অন্তর্ভুক্ত শামিল। ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনীতিকে দীন থেকে সরিয়ে রাখার কোন অবকাশ নেই। এ জন্যেই, সমকালীন অনেক মুসলমানই খ্রিষ্টান ও সেক্যুলারিজমের এ দর্শনের জোর প্রতিবাদ করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, রাজনীতিকে দীন থেকে কখনো আলাদা করা যাবে না।

আল্লামা ইকবালের ভাষায় :

“দীন ছাড়া রাজনীতি বেশ;

চেঙ্গিস খানের মন্ত্র বটে’ ।

 

সেক্যুলারিজম কি ?

সেক্যুলারিজম (Secularism) এর বাংলা অর্থ হচ্ছে: ধর্মনিরপেক্ষতা

সেক্যুলারিজম বলতে বোঝানো হয়— রাষ্ট্র বা সমাজ পরিচালনায় ধর্মকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা রাখা, অর্থাৎ ধর্মীয় আদর্শ, আইন বা অনুশাসনের উপর নির্ভর না করে মানবিক বা ধর্ম-বিচ্ছিন্ন নীতিমালা দ্বারা পরিচালিত হওয়া।

হাল-জামানার বেশ কিছু ইসলামী চিন্তাবিদ-কলামিস্ট আলোচিত সেক্যুলারিজম অর্থাৎ ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পৃথককরণ দর্শনের কঠোর বিরোধিতা করেছেন। আর এ বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা শিকার হয়েছেন আরেকটি অতি সূক্ষ্ম ভুলের। যা বাহ্যত ক্ষুদ্র হলেও এর প্রতিক্রিয়া পরিব্যাপ্ত অনেক। ক্ষুদ্র ও সূক্ষ্ম এ ভুলটিকে আমরা সংক্ষেপে বলতে গেলে এভাবে বলতে পারি : ‘তারা সেক্যুলারিজমের বিরোধিতার আবেগে, রাজনীতিকে ইসলামীকরণের পরিবর্তে ইসলামকেই রাজনৈতিক বানিয়ে ফেলেছেন। বলার কথা ছিল, রাজনীতি ইসলামবিমুখ না হওয়া চাই কিন্তু বলে ফেলেছেন ইসলাম রাজনীতিবিমুখ না হওয়া চাই’

 

কথাটি আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলছি

রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ইসলামের অনেক বিধি-বিধান আছে। অবশ্যই আছে। তাই ঈমানের দাবীও এটাই— প্রত্যেক মুসলমান সামর্থমাফিক অন্যান্য আকামের মতো এর উপরও আমল করবে এবং অন্যকে আমল করার কথা বলবে। শাসকের কর্তব্য হলো, ইসলামী আইন চালু করা, শরীয়ত অনুযায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হওয়া। যদি হয়ে যায় তবে তার অনুসরণ করা। কিন্তু অধুনাকালের বেশ কিছু চিন্তাবিদ লেখক সেক্যুলারিজম বিরোধিতায় এতটা সরগরম ও উত্তেজিত হয়েছেন যে, তারা রাজনীতি ও হুকুমতকে ইসলামের অভীষ্ট লক্ষ্যে পরিণত করে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই ইসলামের মূল টার্গেট, নবীদের বুনিয়াদী লক্ষ্য; অভীষ্ট কামনা ও কাঙ্ক্ষিত মলি। বরং মানব সৃষ্টির লক্ষ্যই হলো, রাজনীতি ও হুকুমত প্রতিষ্ঠা। আর ইসলামের অন্যান্য আকাম, যেমন- ইবাদত ও অন্যান্য আমলকে তারা শুধু দ্বিতীয় স্থানে নামিয়েই ছাড়েননি বরং বলেছেন, রাজনীতি ও হুকুমত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমমাত্র এগুলো। এগুলো হুকুমত প্রতিষ্ঠার একটি পথমাত্র ।

প্রান্তিকতা ও বাড়াবাড়িসঞ্জাত এ ভয়াল মানসিকতার কারণে সবচাইতে মারাত্মক যে ক্ষতিটি হয়েছে তাহলো, দীনের সামগ্রিক চিত্র ও ইসলামী বিধি-বিধানের যথার্থ অবস্থানটাই (Order of Priority) বদলে গেছে। যা য়-চিন্ত ছিল মাধ্যম বা উপায়- তাই মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে সকলের হৃদয়- ায়। আর যা ছিল জীবনের মূল লক্ষ্য তা মাধ্যম ও উপকরণের দেশে গিয়ে ঠাঁই নিয়েছে। এবং এই চিন্তা-ভাবনার পরশে লালিত অনেকের মানসিকতাই আজ এইখানে এসে দাঁড়িয়েছে যে, একজন মুসলমানের জীবনের মূল লক্ষ্য রাজনীতি হওয়া চাই; রাষ্ট্র সংশোধনই হওয়া চাই একজন মুমিনের যিন্দেগীর মূল টার্গেট। তাদের ধারণা হলো, সেটাই মূল কাজ যা এপথে সাধিত হয়; এপথে নিবেদিত ত্যাগই সত্যিকারের ত্যাগ। পথিকৃত মনীষী তিনিই— এ পথে কেটেছে যার যিন্দেগানী। আর দীনের ইবাদত, ইতায়াত, তাকওয়া, যুহুদ, অন্যান্য শাখা; অন্যান্য হিস্সা যেমন- আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর ভয় ও আল্লাহর সমীপে আত্মসমর্পণ ইত্যাকার সবকিছুই চরম অবহেলিত। বরং যারা এসব কাজে নিবেদিতপ্রাণ তাদের সম্পর্কে এ ধারণা পোষণ করা হয় এবং অন্যদের মাঝেও এ ভ্রান্তি ছড়িয়ে

দেয়া হয় যে, এরা মৌলিক বিষয়ে উদভ্রান্ত; মানব জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে এরা অনেক দূরে।

দ্বিতীয় ক্ষতিটি হলো এই

যখন রাজনীতি আর হুকুমত প্রতিষ্ঠাই মানব জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেল, এবং ইবাদতসহ অন্যান্য আকাম উপকরণের কোঠায় ঠাঁই নিল; তখন বলা বাহুল্য যে, কখনো কখনো মাকসুদ ও উদ্দেশ্য লাভের জন্যে, প্রয়োজনের খাতিরে উপকরণের গলায় ছুরি দিতে হয়। অনুরূপভাবে লক্ষ্য অর্জনের স্বার্থে মাধ্যম ও উপকরণগুলোতে প্রয়োজনে হেরফের করতে হয়। কমাতে-বাড়াতে হয় । আর লক্ষ্যকে অক্ষুণ্ণ রাখতে গিয়ে এসবই নীরবে সয়ে নিতে হয় । সুতরাং আলোচ্য প্রান্তিকতাবাদীদের বাড়াবাড়ির ফলে, জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে একথার বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হলো যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের স্বার্থে ইবাদত ও অন্যান্য আকাম পালনে যদি কোন দোষ-ত্রুটি হয়েও যায় তবুও সেটা দোষণীয় নয়। কেননা, এসব একটি বড় উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়েই

হয়েছে।

রাজনীতিকে দীনের মূল লক্ষ্য ও অভীষ্ট টার্গেট ধারণা করা এতটা হাস্যস্পদ, ব্যবসা ও জীবিকা নির্বাহকে ইসলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলা যতটা হাস্যস্পদ ও অবান্তর। যদি লক্ষ্য করা হয় দেখা যাবে, ইসলামের প্রচুর বিধি-বিধান ব্যবসার সাথে জড়িত। হালাল রিযিক উপার্জনের ফযীলত সম্পর্কে বিপুল সংখ্যক হাদীস রয়েছে। এখন যদি কেউ এসব ফযীলতের উপর ভিত্তি করে একথা বলতে থাকে, ইসলামের মূল টার্গেটই হলো ব্যবসা-বাণিজ্য । তাহলে একথাটি যে একান্ত মূর্খতাজনিত অবান্তর ও ভিত্তিহীন তা কোন দলীল প্রমাণ দিয়ে বুঝাতে হবে না ।

বলাবাহুল্য, ব্যবসার মতোই রাজনীতি ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত একটি শাখা বিশেষ । কুরআন-হাদীসে যার ফযীলতের বেশ আলোচনাও রয়েছে। তবে সেসব ফযীলতের আঙ্গিকে রাজনীতিকে ইসলামের মূল লক্ষ্য বলা ব্যবসাকে ইসলামের মূল টার্গেট বানানোর মতোই অবান্তর-অসার ।

হিজরী চৌদ্দশ’ শতাব্দীর শুরুর দিকে- যখন থেকে এদেশের মুসলমানগণ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের থাবা-আগ্রাসন রুখে দাঁড়ারার সংগ্রাম শুরু করলো, তখন থেকেই এই প্রান্তিকতাবাদী নীতি-দর্শন আরো ব্যাপক হতে লাগলো। তখন তারা রাজনীতিকে ‘খিলাফত-ফিল-আরদ’

যমীনের রাজত্ব ও ‘হুকুমতে-ইলাহিয়্যা’ আল্লাহর আইন ইত্যাকার চমকপ্রদ শ্লোগান ও শিরোনামের মাধ্যমে ইসলামের বুনিয়াদী বিষয়ে পরিণত করলো। ধীরে ধীরে এ ভ্রান্তচিন্তা মুসলমানদের মধ্যে নীরবে এতটা ছড়িয়ে পড়লো যে, বড় বড় চিন্তাবিদজনও টের করতে পারেনি কীভাবে তাদের মন-মানসিকতার মূল চাবিকাঠিই বদলে গেলো। স্বাধীন রাজনীতির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তাদের কাছে এতটা প্রকট ছিল, ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনীতির প্রকৃত অবস্থানটা নির্ণয় করা এবং সুদূরপ্রসারী এ ভ্রান্তির সূক্ষ্ম কুফল নিয়ে ভাববার সুযোগই ছিল না তাঁদের হাতে। ফল এই দাঁড়ালো, কেউতো জ্ঞাতে, আবার কেউ অজ্ঞাতে এ ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে বসলেন । আর আন্দোলনের সম্মিলিত কর্মব্যস্ততা বিষয়টি এতটা শক্ত করে দিল যে, অনেক বিদগ্ধ আলিমও নিজের চিন্তাধারার মূল চাবিকাঠির এ পরিবর্তন অনুমান করতে পারলেন না ।

আমার জানা মতে, পরিস্থিতির এ সংকটপূর্ণ অবস্থায় হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহ.)ই সর্বপ্রথম এ সূক্ষ্ম ভ্রান্তির জাল ছিন্ন করে, কুরআন- হাদীসের আলোকে ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনীতির প্রকৃত অবস্থানটি চিহ্নিত করে দিয়েছেন। হযরত থানবী (রহ.) বলেন : আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন :

الذين إن مكنهم فى الأرض أقاموا الصلوة وأتوا الزكوة وأمروا بالمعروف ونهوا عن المنكر والله عاقبة الأمور.

“তাদেরকে যদি আমি পৃথিবীতে হুকুমত দান করি; তাহলে তারা যথাযথ নামায আদায় করবে, যাকাত দিবে, সৎকাজের প্রতি আদেশ ও মন্দকাজে বাধা দিবে । সকল কর্মের শেষ পরিণতি আল্লাহর হাতেই’।

এ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে, দিয়ানত বা দীনদারীই হলো ইসলামের মূল লক্ষ্য। রাজনীতি ও জিহাদ লক্ষ্য-বিষয় নয়। বরং দিয়ানত প্রতিষ্ঠার উপকরণ-উপায় ও মাধ্যম। এ কারণেই দিয়ানত ও তার আহকামতো সমস্ত নবী-রাসূলকেই দেয়া হয়েছে, তবে জিহাদ ও রাজনীতি সবাইকে দেয়া হয়নি। বরং যেখানে জিহাদের প্রয়োজন মনে করা হয়েছে, সেখানেই দেয়া হয়েছে; আর যেখানে প্রয়োজন অনুভূত হয়নি, সেখানে দেয়া হয়নি ৷ কেননা, মাধ্যম ও উপকরণের ব্যাপার এমনটিই হয়ে থাকে ।

কারো মনে আবার এ সন্দেহ জাগতে পারে, অন্য একটি আয়াতের বক্তব্যে তো এর বিপরীত বুঝে আসে। বুঝে আসে যেন রাজনীতি ও রাজ্যপ্রতিষ্ঠাকেই লক্ষ্য বলা হয়েছে; আর দিয়ানতকে তার উপকরণ প্রমাণ করা হয়েছে । আয়াতটি হলো :

وعد الله الذين آمنوا وعملوا الصالحت ليستخلفنهم في الأرض كما استخلف الذين من قبلهم وليمكنن لهم دينهم الذي ارتضى لهم.

‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে, নেক আমল করবে; আল্লাহ অঙ্গীকার করছেন, অবশ্যই তাদেরকে পৃথিবীতে খিলাফত-রাষ্ট্রীয়ক্ষমতা দান করবেন; যেভাবে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে খিলাফত দান করেছেন। আরো প্রতিষ্ঠা দান করবেন সেই দীনের- যা তাদের জন্যে আল্লাহ মনোনীত করেছেন।

বক্ষমান আয়াতটিতে হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্যে ঈমান ও নেক আমলকে শর্ত বলা হয়েছে। এতেই প্রতীয়মান হয়, রাজনীতি ও হুকুমত প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য। এর উত্তর অবশ্য সহজ। আসলে এ আয়াতটিতে ঈমান ও আমলে-সালেহ নেক আমলের প্রতিদানস্বরূপ হুকুমত ও শক্তি প্রতিষ্ঠার ওয়াদা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দীনের বৈশিষ্ট্য হলো, যখন মুসলমানগণ পূর্ণ দীনের অনুসারী হবে, তখন ক্ষমতা তাদের পদচুম্বন করবে; শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠবে তারা। তাই বলবো, এখানে দীনের উপর আমল করার ভিত্তিতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওয়াদা করা হয়েছে। আর যে জিনিসের ওয়াদা- অঙ্গীকার করা হয়, ওটা লক্ষ্য হতে হয় এমনটি নয়। যেমন অন্য একটি আয়াতে ইরশাদ হয়েছে :

ولو أنهم أقاموا التوراة والانجيل وما أنزل إليهم من  لأكلوا من فوقهم ومن تحت أرجلهم. ربهم –

‘যদি তারা তাওরাত, ইঞ্জিল ও তাদের প্রতি অবতীর্ণ কিতাব-কুরআনকে পুরোপুরি অনুসরণ করতো, তাহলে তারা উপর ও তলদেশ থেকে অবাধে রিযিক পেতো।’

এ আয়াতটিতে তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআন  যথাযথ আমল করার বিনিময়ে বিপুল-প্রসন্ন রিযিকের ওয়াদা করা হয়েছে। তাই বলে কি একথা বলা যাবে- দীনের মূল উদ্দেশ্য রিযিক? এবং এটা দীনদারীর বিনিময়ে প্রতিশ্রুত। এর অর্থ দীনদার কখনো ক্ষুধার্ত-বস্ত্রহীন থাকে না। প্রমাণিত হলো, অঙ্গীকৃত হলেই সেটা লক্ষ্য-বিষয় হতে হবে এমনটি জরুরি নয়। তদ্রুপ আমাদের আলোচ্য আয়াতেও ঈমান এবং আমলে- সালেহের বিনিময়ে ক্ষমতা, শক্তি ও হুকুমতের ওয়াদা করা হয়েছে। তাই এটাকে ঈমান ও নেক আমলের বৈশিষ্ট্যই বলতে হবে, লক্ষ্য নয়।

সারকথা হলো

রাজনীতি ও দীনদারী উভয়টার মধ্যে দীনদারীই মানব জীবনের মূল লক্ষ্য। তবে এর অর্থ আদৌ একথা নয়, রাজনীতি কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়; বরং রাজনীতির অবস্থানটা হলো রাজনীতি মানব জীবনের মূল লক্ষ্য নয় । বরং দীনদারীই মানব জীবনের মূল লক্ষ্য। ( আশরাফুস-সাওয়ানেহ্- ৪র্থ খণ্ড, খাতিমায়ে সাওয়ানেহ্ ২৮, ২৯ পৃ. মুলতান থেকে প্রকাশিত ।)

বাস্তব হলো এই, হযরত হাকীমুল উম্মত (রহ.) এই কয়েক লাইনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু সারগর্ভ আলোচনা দ্বারা বিষয়টিকে বিলকুল পরিষ্কার করে দিয়েছেন; আর তা একান্তই আল্লাহর তাওফীকে । হযরত থানবীর বক্তব্যের সারমর্ম হলো এই— রাজনীতির সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই একথাও সহীহ্ নয় যা সেক্যুলারিজমের দর্শন। আবার একথাও ঠিক নয়, মানব জীবনের মূল লক্ষ্য হলো রাজনীতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।

 

দীন ইসলামের আসল লক্ষ্য

মূলত দীন ও ইসলামের আসল লক্ষ্য হলো আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক কায়েম করা। ইবাদাত ও অন্যান্য আমলের মাধ্যমে যার কিঞ্চিত বিকাশ ঘটে মাত্র। আর রাজনীতি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাও এ লক্ষ্য হাসিলের একটি মাধ্যম ও উপায় হতে পারে। কিন্তু ওটা লক্ষ্য বিষয় নয় এবং দীন প্রতিষ্ঠা তথা ইকামতে দীনও এর উপর নির্ভরশীল নয়। বরং মানব জীবনের লক্ষ্য অর্জনের অনেকগুলো মাধ্যমের মধ্যে একটি রাজনীতিও। তাই যে রাজনীতি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এ পথে সহযোগী হয় তা নিশ্চয়ই প্রশংসা পাবার দাবীদার । পক্ষান্তরে যে রাজনীতি মানব জীবনের এ লক্ষ্য হাসিলের পথে সহযোগিতার বদলে দীনী মূল লক্ষ্য বিষয়গুলোকে ভেঙ্গেচুরে ক্ষত- বিক্ষত করে, সে রাজনীতি নিশ্চয়ই ইসলামী রাজনীতি নয়। ইসলামী নামে নামকরণ করলেও তা ইসলামী হবে না আদৌ ।

উপসংহার:

ইসলামের দৃষ্টিতে, রাজনীতি কখনোই মানব জীবনের মূল লক্ষ্য নয়, বরং এটি দীন প্রতিষ্ঠার একটি উপায়। রাজনীতির অবস্থান দীন থেকে পৃথক নয়, তবে এটি কখনোই দীন প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে ধর্মীয় আচার, ইবাদত, এবং আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে জীবন গঠনের পরামর্শ দেয়, আর রাজনীতি একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যায় যাতে দীন প্রতিষ্ঠা সহায়ক হয়। রাজনীতি যদি দীন প্রতিষ্ঠার পথে বাধা সৃষ্টি করে, তবে তা ইসলামী রাজনীতি হিসেবে গন্য হবে না। তাই, একজন মুসলমানের জীবনধারা, সমাজে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক মূল্যবোধ ও দীন অনুসরণের মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করবে।

এই প্রবন্ধ থেকে পাঠক যা শিখবেন:

  • ইসলামে রাজনীতি ও দীন একে অপরের পরিপূরক — আলাদা কিছু নয়।
  • ইসলাম সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করে না, বরং সেক্যুলার ভাবনার বিরুদ্ধেই ইসলামের অবস্থান।
  • রাজনীতি ইসলামের একটি উপায় মাত্র, মূল লক্ষ্য নয় — মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহর ইবাদত ও সম্পর্ক গড়ে তোলা।
  • কিছু ইসলামপন্থী চিন্তাবিদের সূক্ষ্ম ভ্রান্তি চিহ্নিত করা হয়েছে, যারা রাজনীতিকে ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলেছেন।
  • ইবাদত, তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি — ইসলামের মূল দিকগুলোকে অবহেলা করা হলে দীন বিকৃত হয়।
  • রাজনীতি ও হুকুমত ইসলামকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু তা ইসলামের মৌলিক টার্গেট না — এটাও শিখবে।
  • হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (রহ.) এর বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামে রাজনীতির সঠিক অবস্থান বোঝা যাবে।
  • আল কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাজনীতির অবস্থান স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে।
  • ইসলামী রাজনীতি কী এবং কী নয় — সেই পার্থক্য পাঠক বুঝতে পারবে।
  • রাজনীতি ইসলামের শাখা হলেও, এটিকে ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু ভাবা অজ্ঞতা — এই শিক্ষাও তারা গ্রহণ করবে।
  • আদর্শ মুসলমানের লক্ষ্য কী হওয়া উচিত, সেটা বুঝতে পারবে — অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও আত্মিক পরিশুদ্ধি।
  • রাজনীতির মাধ্যমে দীন প্রতিষ্ঠা সহায়ক হলে তা গ্রহণযোগ্য, তবে দীনকে বিকৃত করে রাজনীতি করলে তা ইসলামী নয়।
  • উপায় ও উদ্দেশ্যের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখবে, যা ইসলামী চিন্তাধারায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
error: Content is protected !!
Scroll to Top